ডা. আয়শা আক্তার
করোনা ভাইরাস রোগ ২০১৯ বা কোভিড-১৯ মানুষের একটি সংক্রামক ব্যাধি, যা গুরুতর শ্বাসতন্ত্রীয় রোগলক্ষণ সমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনা ভাইরাস-২ (সার্স কোভ-২) নামক এক ধরনের ভাইরাসের আক্রমণে হয়ে থাকে। প্রথম ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনে এ রোগ শনাক্ত করা হয়। ২০২০ সালের ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ব্যাধিটিকে একটি বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
লক্ষণসমূহ :১. ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় দুই থেকে ১৪ দিন সময় লাগে। ২. বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণ জ্বর। ৩. এছাড়া শুকনো কাশি/গলাব্যথা হতে পারে। ৪. শ্বাসকষ্ট/নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। ৫. অন্যান্য অসুস্থতা (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট, হূদেরাগ, কিডনি সমস্যা, ক্যানসার ইত্যাদি) থাকলে অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে পারে।
কীভাবে ছড়ায় :আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচি দেবার ফলে বাতাসে নিক্ষিপ্ত বহু লক্ষ অতিক্ষুদ্র শ্লেষ্মাকণা বাতাসে ভাসতে শুরু করলে নিকটবর্তী অন্য কোনো ব্যক্তি সেই ভাইরাসযুক্ত বাতাস শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে তার দেহেও ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে। এছাড়াও ভাইরাসের কণা অন্য কোনো পৃষ্ঠে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে কিংবা ভাইরাসযুক্ত হাত দিয়ে স্পর্শের মাধ্যমে পৃষ্ঠের উপাদানভেদে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন লেগে থাকতে পারে, সেই পৃষ্ঠ আরেক জন স্পর্শ করে তারপর নাকে, মুখে বা চোখে হাত দিলে ঐ ব্যক্তির শ্বৈষ্মিক ঝিল্লির মধ্য দিয়ে ভাইরাস দেহে প্রবেশ করতে পারে।
করোনা ভাইরাস বিস্তার রোধে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ : ১. পরীক্ষণ। ২. অন্তরণ (আইসোলেশন)। ৩. সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেন্টাইন)। ৪. অবরুদ্ধকরণ (লকডাউন)। ৫. উপসর্গহীন নীরব সংক্রমণ-বাহক অনুসন্ধান।
প্রতিরোধে করণীয় : ১. ঘনঘন সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধৌত করবেন (অন্তত ২০ সেকেন্ড)। ২. অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করবেন না। ৩. ইতিমধ্যে আক্রান্ত এমন ব্যক্তিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। ৪. কাশি শিষ্টাচার মেনে চলুন (হাঁচি/কাশি সময় বাহু/টিস্যু/কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন)। ৫. অসুস্থ পশু/পাখির সংস্পর্শ পরিহার করুন। ৬. মাছ-মাংস ভালোভাবে রান্না করে খাবেন। ৭. অসুস্থ হলে ঘরে থাকুন, বাইরে যাওয়া অত্যাবশ্যক হলে নাকমুখ ঢাকার জন্য মাস্ক ব্যবহার করুন।
করোনা ভাইরাস বহনকারী সম্ভাব্য ব্যক্তিদের সম্পর্কে করণীয় :১. যে ব্যক্তির জ্বর, সর্দি, কাশি ও হাঁচি হচ্ছে তার থেকে ন্যূনতম তিন থেকে ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, যাতে বাতাসে ভাসমান ভাইরাস কণা শ্বাসগ্রহণের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ না করে। ২. রাস্তায় যত্রতত্র থুতু ফেলা যাবে না, কেননা থুতু থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে। ৩. হাঁচি-কাশি দেওয়া ব্যক্তিকে অবশ্যই কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় অস্থায়ী কাগজের রুমাল বা টিস্যু পেপার দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখতে হবে এবং সেই কাগজের রুমাল সঙ্গে সঙ্গে বর্জ্যে ফেলে দিতে হবে। ৪. খালি হাত দিয়ে কাশি-হাঁচি ঢাকা যাবে না, কেননা এর ফলে হাতে জীবাণু লেগে যায়। ৫. কাগজের রুমাল না থাকলে কনুইয়ের ভাঁজে বা কাপড়ের হাতার ওপরের অংশে মুখ ঢেকে হাঁচি-কাশি দিতে হবে। ৬. পরিচিত কারো করোনা ভাইরাসের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা আইইডিসিআরের হটলাইন নাম্বারে যোগাযোগ করতে হবে, যাতে তাকে দ্রুত পরীক্ষা করা যায় এবং প্রয়োজনে সঙ্গ নিরোধ (কোয়ারেন্টাইন) করে রাখা যায়।
কখন হাত ধৌত করতে হবে, তা জানার জন্য নিচের নির্দেশগুলো মনে রাখা জরুরি :১. নাক ঝাড়ার পরে, কাশি বা হাঁচি দেবার পরে হাত ধোবেন। ২. যে কোনো জনসমাগমস্থল যার মধ্যে গণপরিবহন, হাটবাজার কিংবা যে কোনো উপাসনাকেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত, সেসব স্থান পরিদর্শন করার পরেই হাত ধোবেন। ৩. বাসা থেকে কর্মস্থলে পৌঁছাবার পর হাত ধোবেন। ৪. কর্মস্থল থেকে বাসায় পৌঁছাবার পর হাত ধোবেন। ৫. ঘরের বাহিরের যে কোনো ও বস্তুর পৃষ্ঠতল হাত দিয়ে স্পর্শ করার পর হাত ধোবেন। ৬. যে কোনো রোগীর সেবা করার আগে বা তার পরে হাত ধোবেন। ৭. খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধোবেন। ৮. শৌচকার্য করার পরে হাত ধোবেন। ৯. বর্জ্য পদার্থ ধরার পরে হাত ধোবেন। ১০. পোষা প্রাণী বা অন্য যে কোনো প্রাণীকে স্পর্শ করার পরে হাত ধোবেন। ১১. বাচ্চাদের ডায়াপার ধরার পরে বা শৌচকার্যে সাহায্য করার পরে হাত ধোবেন।
n লেখক :সহকারী পরিচালক, হেলথ্ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম,
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকা