আসুন দেখানো সহানুভূতি নয়, অন্তরের সহানুভূতিকে প্রস্ফুটিত করি

ফারহানা নওশিন তিতলী

পৃথিবীর অর্থনীতির চাকা থমকে গেছে, কাঙ্ক্ষিত স্বস্তির নিঃশ্বাস এখন অনেকটা রূপকথার গল্পসদৃশ। পৃথিবীতে করোনা অসুখ কবে সারবে বোধগম্য হচ্ছে না। করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়ায় প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনতে সংক্রমিত দেশ লকডাউন ঘোষণা করেছে মানুষের প্রাণের স্বার্থে। বাংলাদেশের সংক্রমিত জেলা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিতে বড়ো ধরনের ক্ষতি বয়ে আনবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা আশঙ্কা করছেন পরিস্থিতি মোকাবিলা না করতে পারলে এ ক্ষতির গভীরতা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। 

আইএলওর তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আরব বিশ্বে ৫০ লাখ, ইউরোপে ১ কোটি ২০ লাখ, এবং এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১২৫ কোটি পূর্ণকালীন শ্রমিকের কাজের সমান কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে। চীনে প্রায় ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এক জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বেকারত্ব হার ৩০% এ যাবে যা ১৯৩০ এর মহামন্দার চেয়েও বেশি। 

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ। গত ২৬ মার্চ থেকে কার্যত থেমে আছে দেশ। সমাজের মধ্যবিত্তসহ এমন সময়ে দিনমজুরদের পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক তা আঁচ করা যাচ্ছে সহজেই। প্রতিদিন এ রকম অনেক মানুষ আছে যাদের মহামারির সময় এক মাস টিকে থাকার মতো সঞ্চয় নেই। অথচ দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেরানিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। শুধু খেটে খাওয়া মানুষ নয়, বর্তমানের এ সংকটে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। 

বিশ্বের ২৫০ কোটিরও বেশি মানুষ গৃহবন্দি। দেশের এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে করোনা ভাইরাসের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সরকার কর্তৃক যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে এ প্যাকেজেই আসার আলো দেখতে শুরু করেছে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ। দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বস্তুতপক্ষে অচল হয়ে পড়েছে। এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যাতে করোনার প্রভাব পড়েনি। প্রভাবের মাত্রা ও পরিধি ক্রমশ বাড়ছে। পরবর্তীকালে যেন খাদ্যসংকট দেখা না দেয় সে বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের তদারকি করতে হবে। জমি আবাদের ক্ষেত্রে কৃষকদের উত্সাহিত করার পাশাপাশি ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন।

এরই মধ্যে ত্রাণ বিনিময় নিয়ে সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নানা অরাজকতার খবর শোনা যাচ্ছে। দেশের উচ্চ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায়ে এখনো অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি রয়েছেন যারা এমন কাজে জড়িত। গরিব দুঃখীদের সামান্য খাবার বণ্টনেই যদি এমন দুর্নীতি হয় তাহলে এই বিশাল অঙ্কের প্রণোদনা বাস্তবায়নে কতটুকু সুষম বণ্টন হবে এ নিয়ে সাধারণ মানুষ খুব উদ্বিগ্ন।

বড়ো শিল্প সবসময় বড়ো অঙ্কের ঋণ নেয়। ব্যাংকগুলোও ওসব ঋণ দিতে বেশি আগ্রহ দেখায়। ফলে সবসময় ছোটো প্রতিষ্ঠানগুলো বঞ্চিত হয়। তাই ছোটো উদ্যোক্তা, কৃষক ব্যবসায়ীরা যেন ঋণ পান এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। পাশাপাশি যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা সঠিক পরিমাণে ঋণ পাচ্ছে কিনা, এটাও দেখভাল করতে হবে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের নীতিমালা সহজ হলে দেশের অর্থনীতিতে বড়ো ধরনের পরিবর্তন আসবে।

সারাবছর আমরা বিভিন্নভাবে নিজ জায়গা থেকে চাকরি, ব্যবসা, শিল্প ইত্যাদির মাধ্যমে লাভ বা লোকসান করে থাকি। কিন্তু বর্তমান সময়টি এমন যে লাভের ফসল আপনি বা আমি কেউই দুনিয়া থেকে ভোগ করে যেতে পারব কিনা সন্দেহ। এখন বিবেকবোধ জাগ্রত করার সময়। মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তিকে সমাজ সংসার থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। সেখানে আমরা মৃত্যুর কথা চিন্তা না করে চাল, ডাল, তেল চুরি করা নিয়ে পড়ে আছি। বাংলাদেশে লকডাউন অবস্থার মাস পেরোনোর আগেই দেশে ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ অস্থির হয়ে যাচ্ছেন। এ দায় শুধু সরকারের না। এ দায় আমার, আমাদের। সরকারের একার পক্ষে ত্রাণের সঠিক বণ্টন করা সম্ভব নয়। এ কাজে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মানবিকতার পরিচয় দিতে হবে। তাছাড়া সরকারি ত্রাণ বণ্টনে তরুণ প্রজন্মদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োজিত করে প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করার দ্বার  উন্মোচিত হোক। আসুন দেখানো সহানুভূতির নয়, অন্তরের সহানুভূতিকে প্রস্ফুটিত করি।

n লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ