ইত্তেফাক রিপোট
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলো অর্ডার বাতিল করা এবং কারখানা বন্ধ রাখায় বাংলাদেশের পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সর্বনাশের মুখোমুখি হয়েছে বলে সিএনএন এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর বরাত দিয়ে সিএনএন বলেছে, করোনা ভাইরাসের মহামারির কারণে দেশের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চল লকডাউন বা বন্ধ রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪১ লাখ পোশাক শ্রমিক। এ দেশের একজন শ্রমিক গড়ে ১১০ ডলার (প্রায় সাড়ে ৯ হাজার টাকা) আয় করছে যা, অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উত্স। এই সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ বর্তমানে চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। করোনা ভাইরাসের কারণে সারাবিশ্বেই ব্যবসাবাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তৈরি পোশাকের ক্রেতারাও তাদের অর্ডার বাতিল করছেন। বিজিএমই এর হিসাবে ৩১৭ কোটি ডলারের অর্ডার বাতিল করেছে। ফলে বাংলাদেশের কারখানা এবং এতে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিকেরা মারাত্মক সংকটে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের কারখানাগুলোর সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ বা চুক্তি বাতিল করছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট ড. রুবানা হক সিএনএনকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তির শর্ত পূরণ করার দাবিতে কারখানার পক্ষে দেশে আইনি পথ খুব সীমিত। আমি কোনো অনুদান চাই না, আমি কোনো ধরনের দাতব্য চাই না, আমি কেবল আমাদের কর্মীদের জন্য ন্যূনতম ন্যায়বিচার চাই। সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিপর্যয়কর সংবাদ। কারণ এদেশের ৮০ শতাংশ রপ্তানি তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ১৬ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে এই তৈরি পোশাক শিল্প। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দেড় কোটি কর্মসংস্থান জড়িত। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সিএনএনকে বলেছেন, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি। কারণ এই অবস্থা অনেক লোককে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক মাস ধরে রাজধানী লাকডাউন হয়ে আছে। তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা রাজধানীর আশে পাশে অনেক জেলা থেকে আসত। লকডাউনের ফলে তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। অনেক শ্রমিকের পরিবার গ্রামে বসবাস করছে। তাদের এখন সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো খাদ্যসংকট।
সিএনএনের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বায়ার এইচ অ্যান্ড এম ওয়ালমার্ট, প্রাইমার্কের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ওয়ালমার্ট এক বিবৃতিতে বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানে তারা কেইস-টু-কেইস ভিত্তিতে যোগাযোগ রক্ষা করছে, যাতে করে সমস্যাগুলোকে ন্যূন্যতম পর্যায়ে রাখা যায়। তারা হিসাব করে দেখেছে বার্ষিক যে অর্ডার বাংলাদেশে দেওয়া হতো তার থেকে ২ শতাংশ কমবে এ বছর। প্রাইমার্ক বলেছে, তাদের যা অর্ডার এ দেশে রয়েছে সেগুলো ১৭ এপ্রিলের মধ্যে তারা গ্রহণ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু অন্যান্য বায়ারগণ তাদের অর্ডারের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
করোনা প্রাদুর্ভাবের পর মার্কিন বাজারে খুচরা বিক্রিতে ধস নেমেছে। শুধু মার্চ মাসে খুচরা বিক্রি কমেছে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। মাস ভিত্তিতে বিক্রি কমে যাওয়ার রেকর্ড তৈরি হয়েছে মার্কিন বাজারে। এ বিষয়ে আমেরিকান এপারেল ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও সিইও স্টিভ ল্যমার বলেছে, পরিস্থিতি খুচরা বিক্রেতাদের অর্থ সংকট তৈরি করেছে। ফলে বিশ্বের সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থায় এই সংকট মোকাবিলা করতে বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সরকারকে একসঙ্গে উদ্যোগ নিতে হবে।