পুনরুদ্ধারের ট্রেনে গতি আনতে চাই স্নেহের পরশ

একটুখানি স্নেহের পরশে যদি ভালো হয়ে যায় মন, তবে বাধা কোথায় তা দিতে? আবেগঘন বাঙালির চাওয়া বরাবরই অল্প। সামান্য ডাল-চাল দিয়েই কত সুন্দরভাবে মানিয়ে নেওয়া যায়। মাসের মাইনেটাও যদি বিলম্বে দিতে হয়, একটু বুঝিয়ে বললেই হলো। বলা হয়, সামাজিক নিরাপত্তার কথা। যে নিরাপত্তাবেষ্টনী রয়েছে আমাদের জনগণের জন্য, তা আদৌ যথেষ্ট কি না, সে প্রশ্ন নাই-বা করলাম। বরং সংবিধানের মৌলিক চাহিদার কথা ভুলে যতটুকুই পাওয়া যায়, তাতেই খুশি বাঙালি। বরাবরই যেমনটা ছিল। উলটো দিকও আছে, অভিযোগের অন্ত নেই। পিছিয়ে থাকে না অজুহাতেও। তথাপি স্বীকার করতে হবে যে, গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেই যেন সব চুকে গেল। এমন এক সমাজের কথা বলছি, যখন সবকিছু স্বাভাবিক। আমাদের মতন করে। আর যদি পরিস্থিতি পালটে যায়, যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা এখন, এই মুহূর্তে। এটি এক অস্বাভাবিক সময়। শুধু কথা দিয়ে সন্তুষ্ট করার সময় নয় এটি।

উচ্চবিত্ত, সাধারণ চাকুরে কিংবা পরিযায়ী শ্রমিকদের কথাই যদি বলি—সবাই অনিশ্চয়তায়। এর মধ্যে বড়োদের শঙ্কা বেশি। পুঁজির নিরাপত্তা, ব্যাংকের কিস্তি, বিলাসবহুল জীবন অক্ষত রাখতে প্রাণপণ মরিয়া হয়ে সরকারের দ্বারস্থ হতে বাধেনি তাদের। যুগযুগ ধরে ব্যবসায়ে মুনাফা করেও এই ‘আকালে’ মাত্র তিন মাসের বেতনও তারা দিতে অক্ষম। তাই ব্যবস্থা হলো। তাদের পথ ধরে বাকিরাও পেল। আরো বাকি যারা আছে তাদের কী হবে? বলতে পারেন—সবার জন্যই ব্যবস্থা হয়েছে। বলব, মিসিং লিংক খোঁজেন। দ্বিতীয়বারও বলব, মিসিং লিংক খোঁজেন। তৃতীয়বারও বলব, মিসিং লিংক খোঁজেন।—মানে এখনো আমরা সবার ব্যবস্থা করতে পারেনি। সবার করতে হবে কেন? টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য। সহস্রাব্ধ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ যে সাফল্য দেখিয়েছে, তার আলোকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে কাউকে বাদ দিয়ে হবে না। কাউকে পেছনে ফেলে অধিকাংশই যদি এগিয়ে যায়—তথাপি হবে না।

বলতে পারেন, করোনাকালে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। উন্নত বিশ্ব কিংবা উন্নয়ন-সহযোগীরাও ক্ষতিগ্রস্ত। এত অর্থ কোথায় মিলবে? আসলে অর্থের চেয়ে বড়ো বিষয় ব্যবস্থাপনা। করোনার স্বাস্থ্যগত মূল সমস্যার মধ্যেও এর পরোক্ষ প্রধান সমস্যাই হচ্ছে অর্থনৈতিক। এখন দরকার দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে এটি করতে পারে—তার ওপর নির্ভর করবে কারা কত দ্রুত পুনরুদ্ধারের ট্রেনে চড়তে পারবে। যদিও সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন সংস্থা নয়। স্বতন্ত্র নীতি গ্রহণের স্বাধীনতা তাদের নেই। সেক্ষেত্রে সরকারগুলো সমন্বয় করে নীতি গ্রহণ করবে। সেই নীতি হতে হবে—সবাইকে নিয়ে। কাউকে নগদ অর্থ, কাউকে নীতিসহায়তার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তবে কারা কোন সহায়তা পাবে, তা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে না পারলে উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত অন্য দেশগুলোর অনুকরণ করা যেতে পারে। সেগুলো দেখলে স্পষ্ট হবে যে, আমরা এখনো সবাইকে ‘উদ্ধার তত্পরতা’য় আনতে পারিনি। আবার কোনো গোষ্ঠীকে নীতিসহায়তার বদলে প্রণোদনা দিয়ে ফেলেছি।

বাংলাদেশে ব্যাংককেন্দ্রিক সহায়তাকে অনেকেই আড় চোখে দেখছেন। কারণ, বড়োরা এর সুফল পাবেন। (যাদের একটি অংশের ব্যবসাই হচ্ছে নানা টালবাহানায় ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেওয়া।) এ কথা সত্য যে, কর্মসংস্থানে তাদের ভূমিকা ব্যাপক। প্রকারান্তরে, তাদের মুনাফাও কম নয়। রয়েছে অঘোষিত নানা কিছু। নইলে রপ্তানির টাকা দেশে না আসার খবর প্রায়শই আমাদের চোখে পড়ত না। আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকিও দেন কেউ কেউ। ভ্যাট মওকুফ, আমদানি শুল্ক নমনীয় করা থেকে শুরু করে নানা সুবিধা তারা বছর ধরেই নিয়ে থাকেন। বড়োদের অনেকেরই ভ্যাট ফাঁকির সংবাদও আমাদের চোখ এড়ায় না। এই গোষ্ঠী যেন প্রণোদনার অর্থ সঠিক ব্যবহার করে—তার জোরালো মনিটরিং নিশ্চিত করাও জরুরি। ক্ষুদ্র-মাঝারি শ্রমঘন শিল্প, বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। এদের কারো কারো শঙ্কা—ঘোষিত সুবিধা সবাই পাবেন কি না। এই শঙ্কা যেন বাস্তবে না ঘটে, সেদিকেই তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে হবে।

 বেসরকারি খাতের কর্মীদের ব্যাপারেও ভাবতে হবে। বিশেষত কর্মীরাই তাদের উত্পাদনশীলতা দিয়ে সার্বিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যান। কর্মীনির্ভর বেসরকারি খাতে ইতোমধ্যে নীরব ছাঁটাই চলছে। কারো বেতন বকেয়া পড়ছে। কিন্তু বাড়িভাড়া, সংসার ব্যয় নির্বাহ করতে তাদের আয়ের  অন্য কোনো উত্স নেই। নিম্ন মধ্যবিত্ত এই শ্রেণি রয়েছে বড়ো বিপাকে। বেসরকারি খাতের বিকাশে দক্ষ কর্মীদের অনেকেরই লাফিয়ে লাফিয়ে বেতনভাতা বেড়েছে, যা এই দুঃসময়ে তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেকার হলে তার জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভবপর নয়। এই শ্রেণি ত্রাণের লাইনে গিয়েও দাঁড়াতে পারবে না। এদের নীরব কান্না মন দিয়ে শুনতে হবে। এদের ঢাকায় থাকার জন্য বাড়িওয়ালাদের চলতি বছরের হোল্ডিং ট্যাক্স মওকুফ করা দরকার। সেক্ষেত্রে বাড়িভাড়াও কিছুটা কমানোর সিদ্ধান্ত দেওয়া যেতে পারে। পরিযায়ী শ্রমিকদের অবস্থা তথৈবচ। অসংগঠিত শ্রেণির এই মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে পুনরুদ্ধার-প্রক্রিয়ায় শামিল হওয়ার জন্যই।

 পরিশেষে, একটি প্রস্তাব দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। করোনার প্রভাবে যারপরনাই ক্ষতিগ্রস্ত সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। নিম্ন আয়ের মানুষগুলো সহজেই এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারবে না। এরা হয়তো সরকারের নেওয়া অন্যান্য পদক্ষেপের সুফল পেতে পারেন, তবু আসছে বাজেটে আয়করের সর্বনিম্ন স্তর বাড়ানোর সুপারিশ করছি। অন্তত, এক অর্থবছরের জন্য। এটি বার্ষিক আয়ের হিসাবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলেও সরকারের খুব বেশি ক্ষতি হবে না। বরং বড়োদের ফাঁকি রোধ, ব্যাংকের টাকা লোপাটের তুলনায় এই অঙ্কটা খুবই কম হবে। বদলে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞে উদ্যমী কর্মীবাহিনীর খোঁজ মিলবে। পুনরুদ্ধার-প্রক্রিয়ায় এরাই হবে মূল চালিকাশক্তি।

n লেখক :সাংবাদিক