আরও এক বিস্ময়ের জন্ম দেবে বাংলাদেশ

শুরুতেই একটা কথা দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া দরকার। তা হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশের জনগণের কাদের ভোট দেওয়া উচিত, কীভাবে কার তদারকিতে ব্যালট বাক্সে জনমত পেশ করা বাঞ্ছনীয়, এ ব্যাপারে বাইরের কোনো ব্যক্তি, সংগঠন অথবা দেশের নাক গলানো ঠিক নয়। এখনকার মানুষই তাদের জনপ্রতিনিধিদের বেছে নেবেন। তারাই স্থির করবেন আগামী পাঁচ বছর কার হাতে তারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করবেন। এই অধিকার আর সাবালকত্ব তারা রক্তের বিনিময়ে, অসংখ্য ত্যাগ ও সংগ্রামের ভেতর দিয়ে অর্জন করেছেন। এখানে হস্তক্ষেপ চলবে না। কুটকাচালি চলবে না। এরকম ঘটলে বাংলাদেশ তার অন্তর ও বাইরের সর্বশক্তি জড়ো করে গর্জে উঠবে।

স্পর্শকাতর, শক্তিমান একটি জাতি। আত্মশক্তি ও আত্মসম্মানে ভরপুর। গায়ে সামান্য আঁচড় পড়লেই জনসত্তা হাতে তার ঘোষিত চেতনা আর ভাবাবেগের মশাল তুলে নেয়। রাস্তায় নেমে আসে। বহির্বিশ্ব এ ব্যাপারে কতটা ওয়াকিবহাল জানা নেই আমাদের। কিন্তু প্রতিবেশী ভারত, ভারতের বহুমুখী সমাজ তার শাসক ও বিরোধীরা সবাই সংশয়হীনভাবে একমত যে বাংলাদেশ সংকটে জেগে থাকে। দুর্যোগে এক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং উত্সবের চেহারা খাড়া করে রুখে দাঁড়ায়। আবার সম্পর্কের রক্ষণাবেক্ষণ মেহমানদারিতেও সে অসামান্য। তার প্রতিজ্ঞা আর প্রতিশ্রুতিতে দ্বিধা নেই। নেই মাথা নোয়ানোর অভ্যাস।

ভারতও যেহেতু গণতন্ত্রের অকৃত্রিম প্রহরী এবং এক্ষেত্রে বিশ্বে মুকুট তার শীর্ষে, সে কারণেই কুণ্ঠাহীন তার সামাজিক ইচ্ছা—আমাদের ঘরে গণতন্ত্র আরও পরিণত হয়ে উঠুক। ভোটে, ভোটের পর শান্তির বার্তা আরও বড় হোক এবং এমন এক রাজনীতির স্থায়িত্বের উত্তরণ ঘটুক— যে বাইরের চাপ ও প্রভাবকে কখনও বরদাস্ত করবে না। সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দেবে না। এই সৌহার্দ্য ও সম্পর্কের আবহমান অঙ্গীকারকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখবে এবং গণতন্ত্রের সব পথ চলাকে প্রশস্ত করবে।

এরকম সদিচ্ছা আগেও ছিল। এখনও বইছে। যেহেতু বাংলাদেশের নির্বাচন কণ্ঠলগ্ন, সেজন্য এই মুহূর্তে কলকাতা থেকে দিল্লি, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আসাম থেকে দক্ষিণের সব প্রদেশে পশ্চিমেও শীতের উড়ু উড়ু বাতাসে এই একই শুভেচ্ছা উড়ছে। আড্ডায় আলোচনায় সভা-সমিতির ভাষণেও ভেসে উঠছে শুভাকাঙ্ঙ্ক্ষী ভারতের অন্তরের বার্তা—গণতান্ত্রিকতার সাধনায় আরও ঋদ্ধ হোক বাংলাদেশ।

পেশাদার সাংবাদিক আর সমাজবিজ্ঞানের গরিব ছাত্র আমি। ইদানীং দৈনিক কাগজ সম্পাদনার দায় সামলাতে হয়। নিরন্তর কর্মস্থল থেকে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা তাই আমার স্বাভাবিক ধর্ম। এই সুযোগে প্রতিদিন দেশের নানা অঞ্চলের রাজনীতিক ও সমাজদর্শীদের সঙ্গে কথা বলি। কখনও সাক্ষাতে। কখনও ফোনে। লক্ষ করছি বাংলাদেশ নিয়ে প্রায় সবার আগ্রহ ব্যাপক। এ আগ্রহে কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে হূদ্যতাকে বাড়িয়ে তোলার আয়োজনের জোর অনেক বেশি।

বাংলাদেশকে ভারত কেবল নিকটতম প্রতিবেশী ভাবে না। ভাবে সম্ভাবনাময় সার্বভৌম একটি দেশ এবং ভারতের বহুত্ববাদী সংকল্পের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। দিল্লিতে যারাই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন প্রত্যেকেই চেয়েছেন বাংলাদেশ ভালো থাক। তার দেহ আর ভেতরের শক্তি আরও বাড়ুক। সমৃদ্ধির উত্তরণে সে ক্রমাগত ঋদ্ধ হোক। কখনও শাসক অথবা বিরোধী শক্তি কেউই বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কটাক্ষ করেননি। গত সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্নে যখন কোনো কোনো দেশ অতিরিক্ত তত্পরতায় মেতে উঠল, তখন ভারত দ্বিধাহীন ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, অন্যদের চেয়ে বাংলাদেশকে আমরা অনেক বেশি চিনি। সে আত্মমর্যাদা টিকিয়ে রাখতে জানে। আমরাও তার শুভবুদ্ধির শক্তিকে সম্মান করি।

অতএব, আমরা নিশ্চিত যে বাংলাদেশের পরমাত্মীয় ভারত কখনও তার ঘরোয়া মামলায় মাথা গলাবে না। এ ভোটে, ভোটের পরেও সে তার নির্জোট নিরপেক্ষতা বহাল রাখবে। সরাসরি বলবে, মঙ্গল হোক।

গত এক বছরে আমি চারবার বাংলাদেশ সফর করেছি। সফরের মানচিত্র কেবল ঢাকা কিংবা ঢাকার সংলগ্ন এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামে, প্রত্যন্ত শহরেও যেতে হয়েছে। প্রতিটি সফরেই মানুষের মুখের ভাষা আর দেওয়ালের উচ্চারণ দেখে মনে হয়েছে, দেশের অপ্রত্যাশিত উন্নয়নে তারা মুগ্ধ। স্বাধীনতার চেতনার পাশাপাশি হয়ে ওঠার, আরও বড় হবার, আরও বিকাশের জেদ তাদের সঙ্গী। অসংখ্য রিকশাচালক, সিএনজি ড্রাইভার, ছাত্র-ছাত্রীদের বলতে শুনেছি, আমরা আর পিছিয়ে নেই। সমাজ আর গঠনমূলক রাজনীতি সন্ত্রাস রুখেছে। আতংক হটিয়ে বিশ্বাসের স্থিতিকে উঁচু করেছে। এই স্থিতিশীলতার জয় হোক।

নির্বাচনের প্রাক্কালে যাওয়া হলো না। ইচ্ছে ছিল। বাধ্যবাধকতা আটকে দিয়েছে। তবু খবর রাখছি, প্রতিদিন। ৩০০ আসনের বড় অংশ কাদের দখলে আসবে, কারা সরকার গড়বে তা বুঝতে পারছি। যেহেতু এসব বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তাই আপাতত নীরবতা অবলম্বন করে এইটুকু বলতে পারি, ইতিবাচক শক্তির জয় অবধারিত।

এব্যাপারে খানিকটা বিশদ উচ্চারণ দরকার। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের পর পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গে যে গণরায় আর গণ-উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল, এবারও সাম্প্রদায়িকতা আর জঙ্গিপনার বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ জোট বেঁধে বিশ্বাসযোগ্য শক্তিকে অধিকতর শক্তি জোগাবে। ’৭০ সালেও আমরা দেখেছি, মানুষ ঐক্যবদ্ধ। এবারের ভোটেও তারা ভাষা আন্দোলনের ভাবাবেগ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পাশে দাঁড়িয়ে ভোটকে উত্সবে পরিণত করে বলে দেবেন, বাংলাদেশ জাগ্রত। মানুষের সমবেত ইচ্ছা অপ্রতিরোধ্য। জাতির অখণ্ড ঐতিহ্যের পাশাপাশি অর্জিত উন্নয়ন আর গণতন্ত্রের ক্রমাগত উত্তরণ আর ঊর্ধ্বগমন আমাদের গন্তব্য।

যদিও নানারকম গুজব আর রটনা ভেসে আসছে। আমার ধারণা, সব অপসত্য আর অপশক্তির লক্ষ্যহীন ভাবনাকে নস্যাত্ করে আসন্ন ভোটের রায় বাংলাদেশে আরও এক বিস্ময়ের জন্ম দেবে। গড়ে তুলবে বিজয় আর ইতিহাসের তৃতীয় মিনার।

n লেখক:সম্পাদক, সর্বভারতীয় দৈনিক, ‘যুগশঙ্খ’।

প্রধান সম্পাদক মাসিক ‘আরম্ভ’