করোনার কারণে লোকসানে গাইবান্ধার মরিচচাষিরা

করোনা ভাইরাসের কারণে গাইবান্ধার বিভিন্ন হাটবাজারে পানির দামে বিক্রি হচ্ছে কাঁচামরিচ। বর্তমান বাজারে খুচরা প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি হচ্ছে মাত্র আট থেকে ১০ টাকায়। পাইকারি বাজারে প্রতিমণ মরিচ ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে অর্থাত্ প্রতি কেজি মরিচের দাম পড়ছে মাত্র পাঁচ টাকা। ফলে মরিচচাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তাদের গুনতে হচ্ছে লোকসান। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বাইরে থেকে পাইকাররা আসতে না পারায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ফুলছড়ি, সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ও জেলা শহরের পুরাতন বাজারের আড়তে মরিচ আছে, কিন্তু পাইকার নেই। শহরের পুরাতন বাজারের ব্যবসায়ী ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘চরাঞ্চল থেকে মরিচ এনে এ আড়তে বিক্রি করি। কিন্তু এবার মরিচের ব্যাপক সরবরাহ থাকলেও ক্রেতা নাই। লকডাউনের কারণে জেলার বাইরে থেকে পাইকাররা আসতে না পারায় বাজারের এ অবস্থা।’ ধাপেরহাট বাজারের ব্যবসায়ী আমিনুল হক বলেন, ‘মানুষ কেবল খাবারের জন্য মরিচ কিনছেন, কিন্তু পাইকাররা মরিচ কিনছেন না। ফলে আমরা মরিচের ব্যবসায় লোকসান দিচ্ছি।’

গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান জানান, চলতি বছর গাইবান্ধায় মরিচের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলার সাতটি উপজেলায় ১২ হাজার ১১২ বিঘা জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। কিন্তু চাষ হয়েছে ১২ হাজার ৭৮৭ বিঘায়। এরমধ্যে গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ৬৩৭ বিঘা, সাদুল্লাপুরে ১ হাজার ৫০ বিঘা, পলাশবাড়ীতে ৪৫০ বিঘা, গোবিন্দগঞ্জে ১ হাজার ৬৫০ বিঘা, সাঘাটায় ১ হাজার ৫০০ বিঘা, সুন্দরগঞ্জে ১ হাজার ১২৫ বিঘা এবং ফুলছড়িতে ৬ হাজার ৩৭৫ বিঘা জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ফুলছড়ি উপজেলায় চরাঞ্চল বেশি। তাই এ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জমিতে মরিচের চাষ হয়েছে। ঐ কর্মকর্তা আরো জানান, বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর মরিচ চাষের উপযুক্ত সময়। মাত্র ৬০ দিনে ফলন পাওয়া যায়। এক বিঘায় উত্পাদন খরচ হয় ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা। এক বিঘায় উত্পাদন হয় ৬০ থেকে ৬৫ মণ মরিচ। বর্তমানে বাজার দরে এক বিঘা জমির মরিচ বিক্রি করে কৃষক পাচ্ছেন সর্্বোচ্চ ১৩ হাজার টাকা। অর্থাত্ মরিচচাষিকে বিঘাপ্রতি ২ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

ফুলছড়ি উপজেলার বাঘবাড়িচর গ্রামের কৃষক আবুল হাশেম (৫৫) জানান, এবার আমি আট বিঘা জমিতে দেশি জাতের মরিচ চাষ করেছি। খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ৫০ হাজার টাকার কাঁচামরিচ বিক্রি করেছি। কিন্তু তার মধ্যেই করোনা শুরু হয়। এখন প্রতি কেজি মরিচ মাত্র পাঁচ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। তবুও ক্রেতা নেই। মরিচ নিয়ে বিপাকে পড়েছি। করোনার আগে প্রতি কেজি মরিচের বাজারদর ছিল ২৫-৩০ টাকা।

উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নের খাটিয়ামারি গ্রামের কৃষক খয়বর হোসেন (৫০) জানান, প্রায় ছয় বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছি। বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। প্রতি সপ্তাহে বা ১৫ দিনের মধ্যে একবার করে জমি থেকে মরিচ তোলা যায়। এ পর্যন্ত ফুলছড়ি হাটে নিয়ে গিয়ে ৪০ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করেছি। ফুলছড়ি হাট থেকে প্রাণ কোম্পানির পাইকাররা এসে মরিচ কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু এখন করোনার কারণে তারা আসতে পারছেন না। ফলে মরিচ বিক্রি করতে পারছি না। তাই এবছর লোকসান গুনতে হবে।

সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের হাসানপাড়া গ্রামের কৃষক কফিল উদ্দিন সরকার (৬০) বলেন, এবার আমি এক বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছি। এক বিঘায় খরচ হয়েছে ১৬ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত ১১ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করেছি। কিন্তু এখন করোনার কারণে জমির অবশিষ্ট মরিচ বিক্রি করতে পারছি না। 

এ সব বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্র্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান বলেন, জেলার চরাঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে মরিচের চাষ হচ্ছে। এখানকার মরিচের গুণগত মান অনেক ভালো। কিন্তু করোনার কারণে মরিচের দাম না পাওয়ায় কৃষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবে সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধা পাবেন। গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক  মো. আবদুল মতিন বলেন,  ইউএনওদের মাধ্যমে জেলার সব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছ থেকে সবজি কেনা হচ্ছে। সেই সবজি করোনায় কর্মহীনদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। জেলার ৯ হাজার কর্মহীন মানুষের মধ্যে সবজি বিতরণ করা হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যাতে তাদের উত্পাদিত সবজি ঢাকার পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে পারেন, তারও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।