নিঃসন্দেহে এ শতাব্দে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়ো বিপর্যয় হচ্ছে বিভিন্ন দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। সাধারণভাবে উন্নত দেশগুলো সব দিক থেকে সচ্ছল হওয়ায় এবং তাদের কাছে পর্যাপ্ত রিসোর্স থাকায় তারা এ সংকট কাটিয়ে উঠবে, তবে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আজকের দিনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ যে কোনো কারণে একে-অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। সাধারণত মানুষ সে দেশেই যাতায়াত করে যে দেশটি তার নিজের দেশের থেকে অপেক্ষাকৃত উন্নত। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র আর এ কারণে আমাদের বাংলাদেশ থেকেও অনেক মানুষের প্রবণতা থাকে উন্নত কোনো দেশে পাড়ি জমানো। প্রায় দুই শ বছর ব্রিটিশের অধীনে থাকায় এবং আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আমাদের ক্লাস ওয়ানে থাকতেই ইংরেজি শিখতে হয় এবং ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো বিদেশি ভাষা সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শেখানো হয় না। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ মাতৃভাষার সঙ্গে একটিমাত্র বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ পায় আর এ কারণে যখন কেউ বাইরের কোনো দেশে যেতে চায় তখন প্রথমেই বিবেচনায় নিয়ে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউ জিল্যান্ড এসব দেশ—কেননা সেসব দেশের মানুষের মাতৃভাষা ইংরেজি; তৃতীয় কোনো ভাষা শেখার প্রয়োজন পড়ে না। উন্নত জীবন কিংবা অপেক্ষাকৃত উচ্চ আয়ের পাশাপাশি মানুষের কিছু স্বাভাবিক কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় চাহিদা রয়েছে যেটা আমরা বিবেচনায় আনি না।
সর্বশেষ প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট অনুযায়ী পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী রাষ্ট্রগুলোর তালিকায় একেবারে শীর্ষে থাকা আটটি দেশ হচ্ছে ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া আর নেদারল্যান্ডস। অথচ নিউজিল্যান্ড ছাড়া বাকি দেশগুলো সেরকমভাবে আমাদের দেশের মানুষের আলোচনায় স্থান পায় না। এসব রাষ্ট্রে অপরাধপ্রবণতা ও দুর্নীতির হার পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনেক কম এবং সামাজিক নিরাপত্তা, মানুষের মৌলিক অধিকারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা এসব বিবেচনায় এ দেশগুলো সব দিক থেকে ওপরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ পৃথিবীর অনেক দেশে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেখানে টিউশন ফি দিয়ে পড়াশোনা করতে হয় সেখানে অস্ট্রিয়াতে এখনো যে কেউই কোনো ধরনের টিউশন ফি ছাড়া পড়াশোনা করতে পারে। প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যাবিশিষ্ট কানাডাতে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জাস্টিন ট্রুডো সরকারের ঘোষিত বাজেট সাতাশ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার; সেখানে ৮৮ লাখ জনসংখ্যার দেশ অস্ট্রিয়াতে সরকার ঘোষিত বাজেট ৩৮ বিলিয়ন ইউরো। পর্তুগাল সমগ্র ইউরো জোনের অধীনে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক দিক থেকে কিছুটা দুর্বল, অথচ এমন অবস্থায় পর্তুগালের সরকার মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশটিতে থাকা অভিবাসী সে বৈধ কিংবা অবৈধ যে স্ট্যাটাসের হোক না কেন সবাইকে সে দেশের নাগরিকদের মতো চিকিত্সাসেবা প্রদান এবং একইসঙ্গে SEF-এর মাধ্যমে যাঁরা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির জন্য আবেদন করেছেন সবাইকে পরিস্থিতি বিবেচনায় পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
একজন মানুষের কাছে তার পছন্দ তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাদের অগোচরে অনেক কিছুই ঘটে যায় কিন্তু সেগুলো আমরা সে রকম গুরুত্ব দেই না। কেউ যদি দাবি করেন যে তিনি যুক্তরাজ্যে কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত একজন প্রবাসী তাহলে তিনি যে রকম গুরুত্ব পান, গ্রিস কিংবা পোল্যান্ড কিংবা অন্য কোনো দেশ যেটার তেমন পরিচিতি নেই সে দেশে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে বসবাস করা সত্ত্বেও তিনি তেমন গুরুত্ব পাবেন না—এটা সত্যি দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে এবং সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে মানবিকতার বলে বলীয়ান হয়ে এ বিপর্যয় যাতে কাটিয়ে উঠতে পারি সেজন্য এক হয়ে কাজ করতে হবে।
শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া