মো. লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি
ত্রাণ বিতরণে একের পর এক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন একশ্রেণির অসাধু জনপ্রতিনিধি ও ডিলার। তারা হতদরিদ্রদের টিপসই জাল করে চাল বিক্রি করে দেওয়া, ছবি ঠিক থাকলেও নামের মিল না থাকাসহ বিভিন্নভাবেই চাল আত্মসাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এসব ঘটনা করে অনেকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পার পেয়ে যাচ্ছেন। ত্রাণ বিতরণে অস্বচ্ছতা, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়প্রীতি থাকায় হতদরিদ্রদের অনেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ ওঠেছে। এদিকে জেলার অধিকাংশ এমপি ঢাকায় অবস্থানের কারণে ও যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে মাঠ পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণে ফায়দা লুটছেন একশ্রেণির নামধারী দলীয় নেতাকর্মী। সচেতন মহলের মতে এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না আনা হলে করোনার প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া অভাবী মানুষেরা লকডাউন উপেক্ষা করে ঘর থেকে বের হয়ে পড়বেন এবং এতে মাঠ পর্যায়ে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো বাধাগ্রস্ত হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা মূল্যের চাল বিতরণে অনিয়মের দায়ে গত ১৪ এপ্রিল জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় ডিলার আবদুস সামাদকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আল-আমিন সরকার এবং তিনি তার ডিলারশিপ বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটি বরাবরে সুপারিশ করেন। একই দিন মুরাদনগর উপজেলার দারোরা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ও স্থানীয় ডিলার নুরুজ্জামান সরকারকে নগদ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং তার ডিলারশিপ বাতিল করা হয়। এদিকে জেলার দেবীদ্বার উপজেলার সুবিল ও দক্ষিণ গুনাইঘর ইউনিয়নে সরকারি খাদ্যবান্ধব কার্ড ও চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সুবিল ইউনিয়নের সদস্য আব্দুল মান্নানকে বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এ ইউনিয়নের অন্য ওয়ার্ডেও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। কার্ডে ভুয়া টিপসই থাকলেও চাল পাননি অনেক হতদরিদ্র। দক্ষিণ গুনাইঘর ইউনিয়নে দরিদ্রদের তালিকা তৈরি করে চেয়ারম্যানের কাছে ত্রাণ চাওয়ায় লাঞ্ছিত হন আশেকে এলাহী নামে এক যুবক। এদিকে চালের কার্ড চাইতে গিয়ে আদর্শ সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তোফায়েল আহমেদের হাতে লাঞ্ছিত হন এক নারী। এ ঘটনায় ঐ নারী কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। এমন দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযোগের ঘটনায় হতাশ সাধারণ মানুষ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগীরা জানান, জেলার ১৭টি উপজেলা নিয়ে ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বেশ কয়েকটির এমপিগণ লকডাউনের আগে (১০ এপ্রিল) থেকেই ঢাকায় অবস্থান করছেন। মাঠ পর্যায়ে তাদের (এমপি) যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে এমন অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। জেলা লকডাউন ঘোষণার পর বেশ কয়েক জন এমপি তাদের এলাকায় আসেননি। কথা হয় দু্ই জন এমপির সঙ্গে। নাম প্রকাশে বারণ করে তারা বলেন, এলাকায় না আসলেও ঢাকায় থেকে অসহায় মানুষের পাশে থাকার জন্য মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ঘরে ঘরে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন, পাশে থাকবেন। কিন্তু এই দুর্যোগের সময় জনপ্রতিনিধি যদি অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সরকারের অর্জনগুলো ম্লান হবে।’ কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, ‘অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর তাত্ক্ষণিকভাবে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। অপরাধী জনপ্রতিনিধি কিংবা যিনিই হোন না কেন কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’