নিত্যপণ্যের বাড়তি দরেই শুরু হলো রমজান

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে রমজান উপলক্ষ্যে কেউ যাতে অতিরিক্ত দামে নিত্যপণ্য বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য রাজধানীসহ সারাদেশে চলছে সরকারের বাজার মনিটরিং টিমের অভিযান। অভিযানে লাখ টাকা জরিমানা থেকে শুরু করে দোকান সিলগালা পর্যন্তও করা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। কাজ হচ্ছে না বাণিজ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারিতেও। নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বারবার বলছেন, দেশে চাহিদার তুলনায় চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ছোলা, আদা, পেঁয়াজ, রসুনসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কৃত্রিম উপায়ে কোনো পণ্যের সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে সরকার তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে গত ১৬ এপ্রিল থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত চিনি, ডাল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ভোজ্যতেল, শুকনো মরিচ, মুরগি ও ছোলার দাম বেড়েছে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে আদা ও মসুর ডালের দাম দ্বিতীয় দফায় বেড়েছে। সেই সঙ্গে গত প্রায় দুই মাস ধরে চালের দাম বাড়তি। দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে ময়দা ও গুঁড়ো দুধ। সব মিলিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বিশেষ করে করোনা মোকাবিলায় সারাদেশে টানা এক মাসের ছুটি চলায় সবচেয়ে বিপদের মধ্যে আছে কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষ। তারা রীতিমতো মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাজারে গিয়ে আদার দাম শুনে চমকে যাবেন না এমন ক্রেতা পাওয়া যাবে না। প্রতি কেজি আমদানিকৃত আদা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। অথচ এক কেজি আদার আমদানি খরচ পড়েছে সর্বোচ্চ ১০০ টাকার মধ্যে। তাহলে আদার দাম এত কেন? এর কোনো সুদুত্তর নেই ব্যবসায়ীদের কাছে। দেশি আদাও বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৬০ টাকায়, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে যা ১০০ শতাংশ বেশি।

দাম বেড়েছে শুকনো মরিচেরও। দেশি শুকনো মরিচ কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা এবং আমদানিকৃত শুকনো মরিচ ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি রসুন কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। প্রতি কেজি রসুন বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১৩০ টাকায়। ঝাঁজ বেড়েছে পেঁয়াজেরও। গতকাল বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৫৫ টাকা এবং আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হয়। অথচ ১০-১২ দিন আগেও সব ধরনের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকার মধ্যে।

দাম বেড়েছে সব ধরনের ডালের। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি বড়ো দানা মসুর ডাল ৯০ থেকে ১০০ টাকা, মাঝারি মানের মসুর ডাল ১০০ থেকে ১১০ টাকা এবং ছোটো দানা মসুর ডাল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়। কিন্তু সপ্তাহখানেক আগে প্রতি কেজি বড়ো দানা মসুর ডাল ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা, মাঝারি মানের মসুর ডাল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা এবং ছোটো দানা মসুর ডাল ১০০ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হয়। মুগ ডাল কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা, অ্যাংকর ডাল কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, ছোলা ৫ টাকা বেড়ে ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

গত প্রায় দুই মাস ধরেই চালের দাম বাড়তি। করোনা পরিস্থিতিকে পুঁজি করে মোকামের চাল ব্যবসায়ীরা আরো এক দফা বাড়িয়েছেন চালের দাম। বর্তমানে প্রতি কেজি সরু চাল নাজিরশাইল ও মিনিকেট ৬০ থেকে ৬৮ টাকা, মাঝারি মানের চাল পাইজাম ও লতা ৫০ থেকে ৫৮ টাকা, মোটা চাল ইরি ও স্বর্ণা ৪২ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়, যা সপ্তাহের ব্যবধানে মানভেদে প্রতি কেজিতে ৬ থেকে ৮ টাকা বেশি।

খোলা ময়দার দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা। প্রতি কেজি খোলা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে সয়াবিন তেল, পামঅয়েল ও গুঁড়ো দুধ। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলে ৩ টাকা বেড়ে ৯৩ থেকে ৯৫ টাকা এবং বোতলজাত সয়াবিন তেলে ৫ টাকা বেড়ে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পামঅয়েল প্রতি লিটারে ৩ থেকে ৫ টাকা বেড়ে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা এবং পাম সুপার লিটারে ৫ টাকা বেড়ে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে প্রতি কেজি ডিপ্লোমা গুঁড়ো ( নিউজিল্যান্ড)  দুধ ২০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে ৬০০ থেকে ৬২০ টাকা, ফ্রেশ দুধে ৬০ টাকা বেড়ে ৫৪০ থেকে ৫৫০ টাকা  এবং মার্কস দুধ ১৫ টাকা বেড়ে ৫৫০ থেকে ৫৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১১৫ থেকে ১২৫ টাকা এবং দেশি মুরগি কেজিতে ১০০ টাকা বেড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া গরুর মাংসের কেজি ৬০০ টাকা ও খাসির মাংস কেজিতে ১০০ টাকা বেড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, একশ্রেণির ব্যবসায়ী করোনা পরিস্থিতিতে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এমন অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়ালেও তা ঠিক নয়। কারণ সরকার নিত্যপণ্য উত্পাদন, সরবরাহ, পরিবহন ও বিপণনে বিশেষ নজর দিয়েছে। এজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ সেল কাজ করছে। এছাড়া বন্দরে সবার আগে আমদানিকৃত নিত্যপণ্য খালাসে উদ্যোগ নিয়েছে। কাজেই সরবরাহের সংকটে পণ্যের দাম বাড়ছে এটা ঠিক নয়।

বর্তমানে সারাদেশে ৯০টি বাজার মনিটরিং টিম নিয়মিত বাজার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া টিসিবির কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য ঢাকায় আটটি এবং ৬৪ জেলায় জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু তার পরও প্রতিনিয়ত নিত্যপ্রণ্যের দাম বেড়েই চলেছে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল জব্বার মণ্ডল গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, কেউ যাতে কারসাজি করে অতিরিক্ত দামে নিত্যপণ্য বিক্রি করতে না পারে, সেজন্য আমরা নিয়মিতভাবে বাজারে অভিযান পরিচালনা করছি। তবে এক্ষেত্রে ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। তিনি ব্যবসায়ীদের সেবার মনোভাব নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করার আহ্বান জানান।