করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিত্সার জন্য দেশের প্রথম ডেডিকেটেড হাসপাতাল কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল। এর পরে কুর্মিটোলা ও মুগদা হাসপাতালেও করোনা রোগীর চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হয়। অথচ এসব হাসপাতালে কোনো সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন নেই। সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন ছাড়া আইসিইউ কীভাবে চলছে? রোগীদের সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করতে ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিত্সকেরা। সিলিন্ডার নিয়ে রীতিমতো টানাটানি চলে। এসব হাসপাতালে চাহিদার তুলনায় এক্সরেসহ অন্যান্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও সীমিত। শ্বাসকষ্টই যেখানে মেইন কমপ্লেইন, সেখানে পরীক্ষা করাতে গিয়ে রোগীরা পড়ছেন বিপাকে। বিলম্বে তাদের চিকিত্সা ব্যাহত হচ্ছে। ডাক্তাররাও পরীক্ষার অভাবে বসে থাকেন। রোগী থাকেন বিনা চিকিত্সায়। নিরীক্ষা ছাড়া কী চিকিত্সা দেবেন ডাক্তাররা? বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা করোনা হাসপাতালগুলোর এই দশা দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, যেখানে ১০ দিনে হাসপাতাল তৈরি করা সম্ভব হয়, সেখানে চার মাসেও অক্সিজেনের লাইন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। অব্যবস্থাপনার এটি একটি দৃষ্টান্ত।
করোনা রোগীদের চিকিত্সার এই হাল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএর মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক দুলাল বলেন, দেশের সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের নিয়ে এই হাসপাতালগুলোর জন্য পরামর্শক কমিটি গঠন করা জরুরি। তাদের পরামর্শে সেখানকার চিকিত্সাব্যবস্থা পরিচালিত হলে রোগীরা সঠিক চিকিত্সা পাবে।
এদিকে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের জন্য উত্তরার হোটেল মিলিনায় নার্সদের রাখা হচ্ছে। এক রুমে তিন জন করে নার্স সেখানে আছেন। ইতিমধ্যে ঐ হোটেলে তিন জন নার্স করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু হোটেলটি এখনো লকডাউন ঘোষণা করা হয়নি। প্রত্যেক ডাক্তার-নার্সকে সাত দিন ডিউটি করে সাত দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়। কিন্তু সেটাও মানা হচ্ছে না। চিকিত্সাসেবায় নেই কোনো সমন্বয়। ডাক্তার-নার্সরা পিপিইর মান নিয়ে ভয়ে আছেন। এ কারণে তারা রোগীর কাছে যেতে চান না। এতে রোগীরা সুচিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে কর্মরত একজন ডাক্তার বলেন, রাস্তার পাশের ভুঁইফোড় ক্লিনিকগুলোতেও কয়েক জন করে ক্লিনার থাকে, অথচ এই হাসপাতালে ক্লিনারের সংকট রয়েছে। এখানকার ডাক্তার বা নার্সদের খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। সরকারের বরাদ্দকৃত টাকার মধ্যে ডাক্তার ও নার্সদের খাবার সরবারহ করা হয়। তা-ও নিম্নমানের। নার্সদের খাবার একেবারেই খাওয়ার অযোগ্য। এ অভিযোগ বিএমএর নেতৃবৃন্দের কাছেও এসেছে। এই যদি হয় দেশের সবচেয়ে বেশি প্রস্তুত করোনা হাসপাতালের দশা, তাহলে আমরা কেমন প্রস্তুত বলেন তো? স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এসি রুমে বসে বড়ো বড়ো কথা বলছেন, কিন্তু মাঠে এসে সরেজমিন পরিদর্শন করছেন না।
দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড আইসিইউ বেড রয়েছে মাত্র ১৯২টি। এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে রয়েছে ২৬টি। তবে হাসপাতালটিতে বর্তমানে আইসিইউ বেড চালু রয়েছে ১০টি। দক্ষ লোকবলের সংকটের কারণে বাকি ১৬টি বেড এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের এক চিকিত্সক বলেন, আইসিইউ চালানোর জন্য ডাক্তার-নার্স, ওয়ার্ডবয়, ক্লিনার—কোনোটাই পর্যাপ্ত নেই। বর্তমানে চালু রাখা ১০ আইসিইউ বেডের জন্য ৯ জন চিকিত্সক রয়েছেন, যাদের চার জন এ সপ্তাহে জয়েন করেছেন। নার্স শুরুতে ১০ জন ছিলেন, এখন ২৭ জন। ১০ বেডের জন্য তা ঠিক, কিন্তু এদের দিয়ে বাকি ১৬ বেড চালানো সম্ভব নয়। যে ১০ জন চিকিত্সক রয়েছেন, তাদের মধ্যে ইনিশিয়ালি পেশেন্ট ম্যানেজ করতে পারেন সাত জন। কিন্তু যে কোনো সিদ্ধান্ত নেন তিন জন ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী না থাকা। আইসিইউতে এক শিফটে এক জন ওয়ার্ডবয় ৮ থেকে ১০ জন রোগীর দেখাশোনা করেন। পিপিই পরে তিন ঘণ্টার বেশি কাজ করা কঠিন; তাদেরও খুব কষ্ট হচ্ছে। আইসিইউর রোগীকে পাশ ফিরিয়ে দেওয়া বা অন্য কাজগুলো ঠিকমতো হচ্ছে না। লোকসংকটের কারণে সব বেড চালু করা যাচ্ছে না বলে অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
এছাড়া হাসপাতালটির আইসিইউতে ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটিজের সংকট রয়েছে। প্রতি বেডে ইন্টারন্যাশনাল গাইডলাইন অনুসারে সিরিঞ্জ পাম্প (আইসিইউতে যে ওষুধ ব্যবহার করতে হয় তা খুবই অল্প অল্প করে দিতে হয়; যে ডিভাইস দিয়ে ওষুধ বা স্যালাইন দেওয়া হয়, তাকে সিরিঞ্জ পাম্প বলে) থাকতে হয় চারটি করে; কিন্তু এখানে রয়েছে একটি করে। ১০ বেডের জন্য ১০টি সিরিঞ্জ পাম্প রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ৪০টি প্রয়োজন। ঐ চিকিত্সক জানান, আইসিইউতে ভেন্টিলেটর, ডায়ালাইসিস, পোর্টেবল এক্সরে মেশিন ব্যবহার করতে সমস্যা হচ্ছে বিদ্যুত্-পানির সংকটের কারণে। যে সাবস্টেশন আছে, তা ২৬ বেডের আইসিইউ চালাতে পর্যাপ্ত নয়। সিটি স্ক্যান মেশিন যখন ব্যবহার করতে হয়, তখন হাসপাতালের একটা অংশের বিদ্যুত্ বন্ধ রাখতে হয়।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের সুপার ডা. শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘জনবলের সংকট ছিল, তবে আমরা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এ সংকট নিরসনের চেষ্টা করছি। এছাড়া অন্য সমস্যারও সমাধান করা হবে।’
শুধু কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল নয়, কোভিড-১৯ চিকিত্সার জন্য ডেডিকেটেড কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালেও জনবলের ঘাটতি ও লজিস্টিক সমস্যা রয়েছে। কুর্মিটোলা হাসপাতালের আইসিইউতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন নেই। এসব ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সাব্যবস্থায় কিছু ঘাটতি আছে। এগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিত্সা দিতে সরকার ঢাকা ও এর আশপাশের ১২টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালকে বিশেষভাবে তৈরি করছে। তবে সব হাসপাতাল এখনো সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। আবার যেসব হাসপাতাল প্রস্তুত আছে, সেখানেও যাচ্ছে না রোগী। আছে ভেন্টিলেশন ও নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের (আইসিইউ) সংকটও। বেসরকারি হাসপাতালগুলোও সরকারের নির্দেশ পুরোপুরি মানছে না। দেশে এখনো পর্যন্ত এন-৯৫ মাস্কের তীব্র সংকট রয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের সিদ্ধান্তহীনতায় রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। করোনা রোগীর চিকিত্সা দেওয়ার কথা ছিল রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। এজন্য হাসপাতালটি সাত দিন বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলা হয়েছে, আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন থেকে এই হাসপাতালে আগের মতোই সাধারণ রোগীদের চিকিত্সা চলবে।