করোনা সংকটে বিশ্ব আজ দিশেহারা। এটি একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকট। এই দুর্যোগ আরো কত দিন চলবে তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। ধনী দেশগুলোর নাজেহাল অবস্থা দেখে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষ আরো বেশি চিন্তিত। আমরা আমাদের স্বাস্থ্য খাতে খুব সামান্যই বিনিয়োগ করে থাকি। জিডিপির ১ শতাংশেরও নিচের স্বাস্থ্য বাজেট বছরের পর বছর ধরেই আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে দুর্বল করে রেখেছে। আমরা আমাদের ডাক্তার ও স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পর্যাপ্ত সুযোগ ও সম্মান যে দিতে পারিনি, সে কথাটি মেনে নিতে দোষের কিছু নেই। দুর্যোগ ও দুঃসময় থেকেই আমরা উপযুক্ত শিক্ষা নিতে পারি। আমার ধারণা, আগামী দিনের বাজেট ও পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চয় দেওয়া হবে। আসন্ন বাজেটে এ খাতের জন্য জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশের কাছাকাছি বরাদ্দ দেওয়া উচিত। তবে আমাদের বাঁচার প্রয়োজনেই চলমান বাজেটের পুনর্বিন্যাস করে স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত অর্থ ও জনশক্তি প্রদানের উপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষুনি ২ হাজার ডাক্তার এবং ৬ হাজার নার্স নিয়োগের যে নির্দেশ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা যথার্থ।
করোনা ভাইরাসকে বাগে আনতে দ্রুত এবং পর্যাপ্ত পরীক্ষা করা, শনাক্ত করা, কোয়ারেন্টাইন করা এবং চিকিত্সা করার প্রতিটি ধাপেই বাড়তি অর্থ লাগছে। কোনো দিকে না তাকিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য এই অর্থ সরকারকে নির্দ্বিধায় দিতেই হবে। ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য তাদের সুরক্ষা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর সর্বোচ্চ রক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই। তাই প্রশ্ন যখন জীবন-মরণের তখন কোনো ধরনের নীতি শৈথিল্য ও অস্বচ্ছতার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত ছাড়া আমরা যেন এই লড়াইয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দেই, যাতে আখেরে শত্রুরই জয় হয়। এরই মধ্যে তথ্য পাওয়া গেছে যে, ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ৩২৪ জন ডাক্তার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তার মানে এর আগের সপ্তাহে প্রতিদিন ৩০ জন করে ডাক্তার আক্রান্ত হয়েছেন! একাধিক ডাক্তার মারাও গেছেন। অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। শুধু স্বাস্থ্যসেবীই নন ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ২১৮ জন পুলিশ কর্মীও আক্রান্ত হয়েছেন। ৬৫২ জন কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। সম্মুখসারির যোদ্ধাদের আরো অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। আমাদের অনেকেই অসচেতন ও দায়িত্বহীন আচরণ করছেন বলেই আজ এই সেবাদানকারীদের এমন বিপদে পড়তে হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসংকটের কারণে দিশেহারা মানুষের ঘাড়ে আরেক সংকট খাদ্যসংকট। এমনিতেই আমাদের এক-পঞ্চমাংশ মানুষ গরিব। করোনার কারণে সার্ভিস খাতসহ অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রায় সবাই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। যারা সামাজিক সুরক্ষা তালিকায় ছিলেন তারা সরকারের দেওয়া খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। সরকার জানিয়েছে, প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষকে সরকার খাবার সহায়তা দিয়েছে। দেশের নানা এনজিও, সামাজিক সংগঠন এবং বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানের কেউ কেউ অভুক্ত মানুষকে খাবার সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছেন। গ্রামের অবস্থা খানিকটা ভালো। সামাজিক বন্ধনও গ্রামে অটুট রয়েছে। তাই সমাজ অভুক্তজনদের খাবার প্রদানে কারপণ্য করছে না। আর সরকারের বয়স্কভাতা, বিধবাভাতা, কর্মসৃজন সুযোগ, দুস্থজনদের জন্য কর্মসূচি, গর্ভবতী মা ও স্তন্যপানকারী সন্তানের মায়েদের জন্য বেশ কিছু সামাজিক কর্মসূচি চালু আছে। ১০ টাকা কেজি চালসহ ডাল, তেল বিক্রির কর্মসূচিও রয়েছে। এর বাইরেও স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারও এই সমাজ বুভুক্ষার বিরুদ্ধে খুবই তত্পর। তাছাড়া, গ্রামে ব্র্যাকসহ অনেক এনজিও ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সেই তুলনায় শহরের গরিব মানুষ বেশ বেকায়দায় পড়ে গেছেন। ‘দিন আনি দিন খাই’ ধরনের অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষগুলো হঠাত্ করে কর্মহীন হয়ে পড়ে গেছেন। তারা কোনো প্রতিষ্ঠিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও নেই। রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, ঠেলাগাড়িওয়ালা, পথের ধারের দোকানদার, ফেরিওয়ালা, নির্মাণশ্রমিক, গণপরিবহন শ্রমিক এবং গৃহকর্মীসহ অনানুষ্ঠানিক খাতের অসংখ্য মানুষের ঘরে খাবার নেই। নগরের মেয়র, ওয়ার্ড কমিশনার, স্বেচ্ছাসেবী, এনজিওকর্মীরা তাদের তালিকা করছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রিলিফও দিচ্ছেন। কিন্তু বাঁচার জন্যে তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। খাবার ছাড়াও তাদের ঘরভাড়া, বিদ্যুত্, পানি ও গ্যাস খরচ আছে। অথচ হাতে টাকা নেই। এদের জন্য নগদ সহায়তার কোনো বিকল্প নেই। ভারত সরকার মাইগ্রেন্ট শ্রমিকসহ এসব অনানুষ্ঠানিক কর্মীকে নগদ সহায়তা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেবার জন্য অচিরেই অধ্যাদেশ জারি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা কেন পারব না? প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবীরা চাইলে দ্রুতই তাদের তালিকা করে প্রত্যেকের মোবাইল ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করতে পারেন। ২৬ লাখ গার্মেন্টস কর্মীদের নতুন করে মোবাইল ব্যাংক হিসাব মাত্র কদিন আগে খোলা গেলে এদের জন্য কেন তা সম্ভব নয়? জেলে, বেদে, তৃতীয় লিঙ্গ, পরিচ্ছন্ন কর্মী, গ্যারেজ ও পরিবহন কর্মী এবং তাঁতিরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
পহেলা বৈশাখ ও ঈদের জন্য ৭ লাখ তাঁতি নানা রঙের শাড়ি ও অন্যান্য পোশাক তৈরি করেও বিক্রি করতে পারছেন না। তাদের হাত খালি। কৃষকেরাও টম্যাটো, কপি, বেগুন, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া উত্পাদন করে বিপাকে পড়েছেন। বিক্রি করতে পারছেন না। অথচ শহরে এসব পণ্যের দাম আকাশচুম্বি। সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার কারণেই এমনটি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মীরা জানেন কোন কৃষক কী অবস্থায় আছেন। তাদের পণ্য বিক্রি করার সুযোগ তারাই করে দিতে পারেন। তাছাড়া আমাদের এখন অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের দায়িত্বও স্থানীয় প্রশাসন নিতে পারে। আমাদের নগর পিতাদের এ জন্য আরেকটু তত্পর হবার সুযোগ রয়েছে।
আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা বৃদ্ধির অংশ হিসেবেই এই সময়টায় বোরো ধান কাটা সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন রয়েছে। উল্লেখ্য, বোরো ফসল আমাদের মোটা চালের ৫৪ শতাংশ জোগান দেয়। আউশ দেয় ৭ শতাংশ। স্থানীয় চালের বাজারের সিংহভাগই জোগান দেয় এই দুই ফসল। এপ্রিলের শেষ থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলে এই ধান কাটার মৌশুম। প্রায় ২০ শতাংশ বোরো ধান উত্পাদিত হয় সিলেট বিভাগ ও হাওর অঞ্চলে। হঠাত্ বন্যায় ভেসে যেতে পারে বলে হাওরের ধান কাটা খুব তাড়াতাড়ি শেষ করতে হয়। তবে আশার কথা জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, শিক্ষা অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো তত্পর হয়েছেন হাওরের ধান কাটা নিশ্চিত করার জন্য। যেমন—সুনামগঞ্জের ডেপুটি কমিশনার কথা বলেছেন লালমনিরহাটের ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে। লালমনিরহাট থেকে একদল ধান কাটা শ্রমিক সুনামগঞ্জের পথে রওনা হয়ে গেছেন। আশপাশে থেকেও শ্রমিক জড়ো হয়েছেন হাওর অঞ্চলে। সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সার্কুলার জারি করেছে এই শ্রমিক যেন স্কুল গৃহ ব্যবহার করতে পারেন। শিক্ষক ও ছাত্রদের স্বেচ্ছাশ্রমে ধান কেটে দেবার আহ্বান জানিয়েছে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ। এমন কি লকডাউনে আটকে থাকা পরিবহন কর্মী, ছোটোখাটো দোকানদার ধান কাটতে নেমে পড়েছেন। এর বাইরে দুশোরও বেশি রিপার ও কমবাইন্ড হার্ভেস্টার ভর্তুকি মূল্যে যান্ত্রিকভাবে ধান কেটে বস্তায় বেঁধে দিচ্ছে। জেলা প্রশাসক ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ মিলে এই সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। কৃষক লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মী ও নেতারাও ধান কাটতে নেমে পড়েছেন। দুর্যোগ দূর সময়ে যে বাঙালি জেগে ওঠে এটিই তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ।
সরকার কৃষকদের জন্য হাজার কোটি টাকার ভর্তুতি ঘোষণা করেছে। আরো দেড়শ কোটি টাকার বীজ কেনার অর্থ দেবার কথা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়নের কথা ঘোষণা করেছে। ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে আরো ৩ হাজার কোটি টাকার গ্রামীণ পুনঃঅর্থায়নের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ফসল উত্পাদন ও কুটির ক্ষুদ্র ও মধ্য উদ্যোক্তাদের জন্য নয়া পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করার কথা বাংলাদেশ ব্যাংক ভাবছে। সরকার এসএমই খাতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এসব কিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে যদি করোনা ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। সেজন্যই স্বাস্থ্যসংকট সমাধানে আরো বেশি মনোযোগী হবার প্রয়োজন রয়েছে। আশার কথা, আমাদের প্রধানমন্ত্রী দক্ষ সেনাপতির মতো করোনা সংকটের বিরুদ্ধে এক তীব্র লড়াই পরিচালনা করছেন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং স্বাস্থ্য সেবীরা বীরের মতো লড়ছেন। আমাদের সমাজও বসে নেই। রাজনৈতিক কর্মী, নেতা, এনজিও কর্মী, সমাজকর্মী—সবাই এক যোগে জীবন ও জীবীকা রক্ষার এক অসামান্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। আসুন, আমরা সংগ্রামী মানুষগুলোর মনোবল চাঙ্গা রাখি। আমাদের নিজ নিজ জায়গায় থেকে এদেশের সংকটে পড়া মানুষের বুভুক্ষা দূর করতে ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যার যতটুকু সাধ্য তাই নিয়ে পাশে দাঁড়াই।
n লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
যোগাযোগ : dratiur@gmail.com