‘চারতলা থেকে তিনতলায় নামছি। দুইটা সিঁড়ি নামার পর আর নামতে পারতাছি না। শরীর একেবারে দুর্বল হয়ে গেছে। পরে তিনতলায় নিয়া বসাইয়া দেওয়ার পর একদিকে হেলে পড়লেন। তখন তিনতলার এক ভাড়াটিয়ার কাছে আমার মেয়ে গিয়ে বলল যে আন্টি আমারে একটু জল দেন। মেয়েকে ধমক দিয়ে দরজা আটকায়া দিছে। একটু জল দেয় নাই।’
নারায়ণগঞ্জের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী খোকন সাহার মৃত্যুর আগ মুহূর্তে নিজের পরিবারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া করুণ ঘটনা সম্পর্কে এভাবেই বলছিলেন তার স্ত্রী তৃশা সাহা। গত রবিবার দুপুরে করোনা উপসর্গ নিয়ে নিজ বাসার সিঁড়িতেই মারা যান খোকন সাহা। মরদেহটি সিঁড়িতেই পড়ে ছিল তিন ঘণ্টা, সহায়তায় কেউ এগিয়ে আসেনি।
খোকন সাহা নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা এলাকায় একটি বাড়ির চতুর্থ তালায় বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। বেশ কয়েকদিন যাবত্ অসুস্থ ছিলেন। এর মধ্যেই অবস্থা গুরুতর হয় তার। হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ফোন করে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশিদের ডাকতে থাকেন স্ত্রী তৃশা সাহা। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি। বাধ্য হয়ে শাশুড়ির সহযোগিতায় নিজেই হাসপাতালে নেওয়ার জন্য স্বামীকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকেন। কিন্তু অসুস্থ শরীর সিঁড়ি বেয়ে নামার ধকল নিতে পারেনি। তিন তলাতে নামার পরেই শরীর ছেড়ে দেয়। এরপর প্রায় তিন ঘণ্টা সেখানেই পড়ে ছিলেন খোকন সাহা। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি কেউ এগিয়ে আসেনি। করোনার ভয়ে কেউ এগিয়ে না আসায় তাদের আত্মীয়রা ফোন করে খবর দেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদকে। কয়েক ঘণ্টা পর খোরশেদ তার স্বেচ্ছাসেবী টিম নিয়ে ছুটে যান মৃতের সত্কারে। স্বেচ্ছাসেবী দলের সাহায্যে সিঁড়িতে পড়ে থাকা লাশ নামিয়ে নিয়ে আসেন। নিজেদের গাড়ি দিয়ে শ্মশানে নিয়ে যান। আত্মীয়-স্বজনদের কেউ না আসায় মুখাগ্নি দেওয়ার দায়িত্বও পড়ে কাউন্সিলর খোরশেদের কাঁধে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কাউন্সিলর খোরশেদ বলেন, ‘এই যে প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজনরা সাড়া দিচ্ছে না। এতে মানবিক সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা যদি পারি আপনারা কেন পারবেন না? সেই মেয়ে দুটির কথা চিন্তা করে দেখেন তাঁদের মনের কী অবস্থা। বাবাকে তারা দীর্ঘক্ষণ সিঁড়িতে পড়ে থাকতে দেখেছে। সবার প্রতি অনুরোধ জানাই মাস্ক পরে, গ্লাভস পরে যে কোনো করোনা রোগীর সেবা করা যায়। কোনো ভয়ের কারণ নাই।’