করোনা পরীক্ষায় অবহেলা হইবে আত্মঘাতী

নানান বিধিনিষেধ, সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন সত্ত্বেও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এবং মৃত্যুর গ্রাফ বিশ্বব্যাপী উপরের দিকে উঠিয়াই চলিতেছে। করোনাকে প্রতিহত করিতে যেই মারণ বিষ প্রয়োগ করা হইতেছে, তাহার নাম লকডাউন। এই বিষের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের অর্থনীতির শরীরে এত ব্যাপক রক্তক্ষরণ হইতেছে যে, করোনা-পরবর্তীকালে এই ক্ষত দূর করিতে সারা বিশ্বের কালঘাম ছুটিয়া যাইবে।

যেই লকডাউনের জন্য এত ক্ষতি, সেই লকডাউন এবং বিবিধ বিধিনিষেধের মাধ্যমে করোনাকে কিন্তু আটকানো যাইবে না। করোনার প্রবল বিস্তারকে কিছুটা প্রলম্বিত করা যাইবে মাত্র। সুতরাং লকডাউনের কারণে যেইটুকু প্রলম্বিত সময় পাওয়া যাইতেছে উহাকে সর্বাগ্রে কাজে লাগাইতে হইবে করোনা-আক্রান্তদের শনাক্তের ব্যাপারে। কারণ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা-পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক মহামারি হিসাবে ঘোষণার পূর্ব হইতেই রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষার ব্যাপারে সর্বাগ্রে জোর দিয়া আসিতেছে। সংস্থাটি বলিতেছে, চিকিত্সা ও সংক্রমণ প্রতিরোধে রোগ শনাক্ত হওয়াটা সবচাইতে জরুরি। অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার হইল, করোনা শনাক্তে আমাদের যেই অবকাঠামো ইতিমধ্যে যুদ্ধকালীন তত্পরতায় গড়িয়া তোলা দরকার ছিল, আমরা তাহা করিতে পারি নাই। ইহার ফলে করোনার উপসর্গ যাহাদের রহিয়াছে তাহাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময়মতো করোনার টেস্ট করা সম্ভব হইতেছে না। করোনা ভাইরাসের মূল সমস্যা হইল, উহা প্রচণ্ড সংক্রামক হইবার কারণে করোনা-পজিটিভি ব্যক্তিদের শনাক্ত করিতে না পারিলে উহা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাইতে শুরু করে। আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হইল, প্রতি মিলিয়নে আমরা অত্যন্ত স্বল্প পরিমাণেই করোনা পরীক্ষা করিতেছি। গত এক সপ্তাহে ইহার পরিমাণ তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় বৃদ্ধির পরও ওয়ার্ল্ডোমিটারের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, প্রতি মিলিয়নে আমরা মাত্র ৩৩২ জনের করোনা পরীক্ষা করিতেছি। আমাদের তুলনায় প্রায় সাড়ে আট গুণের অধিক জনসংখ্যার দেশ ভারত (প্রতি মিলিয়নে ৫১৯) আমাদের চাইতে অধিক টেস্ট করিতেছে। এমনকি প্রায় কাছাকাছি জনসংখ্যার দেশ হইবার পরও পাকিস্তান প্রতি মিলিয়নে ৭১২ জনকে করোনা টেস্ট করিতেছে। অন্যদিকে ইউরোপে করোনায় সবচাইতে অধিক মানুষ মারা যাওয়া ইতালিতে প্রতি মিলিয়নে সাড়ে ২৯ হাজার ব্যক্তির করোনা পরীক্ষা হইতেছে। যুক্তরাষ্ট্রে যেইখানে ৫৭ লক্ষ মানুষের করোনা পরীক্ষা হইয়াছে, সেইখানে আমরা করিয়াছি মাত্র ৫৪ হাজার ৭৩৩ জনের। পরিতাপের বিষয় হইল, আমাদের দেশে অনেকেই চেষ্টা করিয়াও করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা করাইতে পারিতেছেন না। কেবল তাহাই নহে, যাহারা পরীক্ষা করিয়াছেন, তাহাদের কেহ কেহ ফলাফল জানিতে পারিতেছেন না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনা সমস্যার বিশালতা অনুধাবন করিতে পারে নাই।

যেইখানে লকডাউনের মতো চরম অস্ত্র প্রয়োগ করা হইতেছে এবং অর্থনীতির সমূহ ক্ষতি না মানিয়া উপায় থাকিতেছে না, সেইখানে প্রতিটি মূল্যবান দিনকে এক রকম হেলায় নষ্ট করিয়াছে আমাদের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এখন যখন করোনা অধিক পরিমাণে বিস্তার লাভ করিতেছে তখন ইহার সাসপেক্টেড রোগীদের নমুনা সংগ্রহ, নমুনা পাত্রজাত করা এবং নমুনা পাঠানোর ক্ষেত্রেও ত্রুটি থাকিতেছে। এইভাবে কি আমরা করোনার মতো অতি রহস্যময় ভয়ংকর ছোঁয়াচে জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়িতে পারিব? অতি দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত লইতে আর বিলম্ব কাম্য নহে।