করোনা মহামারিতে বদলে গেছে পৃথিবীর নিয়ম। একসঙ্গে পৃথিবীর ২৩০ কোটি মানুষ এর আগে কখনো স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি হয়নি। বন্ধ হয়ে গেছে কলকারখানা-যানবাহনের চাকা, থমকে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছু। করোনা আতঙ্কে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপনের প্রণালিও। পরিবর্তন এসেছে মানুষের স্বপ্নেও। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে অনেকেই ভয়ানক স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।
করোনা ভাইরাস মহামারি হিসেবে দেখা দেওয়া এবং বিশ্ব জুড়ে লকডাউন শুরু হওয়ার পর গবেষকরা মানুষের স্বপ্নের তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন। ফিলিপাইন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা অনেকেই অস্বাভাবিক গভীর আর অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছেন।
ঐ গবেষণা থেকে জানা যায়, লকডাউনে থাকার দুই সপ্তাহ পর থেকে ফিলিপাইনের ১৯ বছর বয়সি একজন বাসিন্দা অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এলিসা অ্যাঞ্জেলিস নামের ঐ ব্যক্তির কথায়- আমি দেখলাম, মধ্যরাতে আমাকে একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং একজন চিকিত্সক আমার হাতে অপারেশন করছেন। কয়েক মুহূর্ত পরে আমার মনে হতে লাগল, আমার শুধু যেন একটি হাত আছে। এমনকি আমি দেখতে পেলাম, ডাক্তার আশপাশে হাঁটাহাঁটি করছেন এবং আমার বিচ্ছিন্ন হাত নিয়ে খেলা করছেন।
এরকম স্বপ্ন দেখা মানুষ এলিসা একাই নন। মূলত বাস্তব জীবনে মানুষ যা দেখে ভয় পান অনেকেই সে রকম স্বপ্ন বেশি দেখতে শুরু করেছেন এই করোনা মহামারির মধ্যে। অনেক মানুষ জানিয়েছেন, ভাইরাসের বিস্তার আর লকডাউন শুরুর পর থেকে তারা এখন অনেক বেশি গভীর আর বিচিত্র স্বপ্ন দেখছেন। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির মনোবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডেইরড্রে ব্যারেট গত মার্চ মাস থেকে মানুষের স্বপ্নের তথ্য জোগাড় করতে শুরু করেন। করোনা মহামারির ফলে মানুষের স্বপ্নের ওপর কেমন প্রভাব পড়েছে, তা দেখতে চেয়েছেন তিনি।
অধ্যাপক ব্যারেট বলেন, যে কোনো বড়ো ধরনের চাপ তৈরি হলেই মানুষের অদ্ভুত, উদ্বেগের স্বপ্ন দেখার প্রবণতা বেড়ে যায়—আমার জরিপেও সেটা ব্যাপকভাবে বেরিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, অনেকে জানিয়েছেন, তাদের স্বপ্ন অনেক সময় করোনা ভাইরাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। যেমন একজন বলেছেন, কন্টাজিয়ন সিনেমা দেখার পর তিনি স্বপ্নে দেখতে পান যে, তার কোভিড-১৯ হয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কের সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয়গুলোর একটি স্বপ্ন দেখা ব্যাপার, যা সবচেয়ে অদ্ভুত এবং সবচেয়ে কম ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছে।
লুইগি ডে জেনারো, যিনি মহামারি শুরু হওয়ার পর আটকে থাকা ইতালিয়ানদের দুঃস্বপ্ন নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পেয়েছেন, নিজেদের দেখা স্বপ্ন ঠিকঠাকভাবে মনে করতে পারার সক্ষমতা মানুষের রাতারাতি বেড়ে গেছে। উদ্বেগের কারণে ভালো ঘুম না হলে এরকম দুঃস্বপ্ন দেখার প্রবণতা বাড়ে। অনেক সময় রাতে মানুষের বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার ফলে এ ঘটনা ঘটে। আবার অনেক সময় তারা এমন একটি অবস্থায় থাকেন যাকে বলা হয় র?্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম। আরইএম ঘুমে চোখ নড়তে থাকে, শ্বাস এবং রক্তপ্রবাহ দ্রুত হয়ে যায় এবং শরীর একটি অবস অবস্থায় চলে যায়, যাকে বলা হয় অ্যাটোনিয়া। ঘুমের মধ্যে ৯০ মিনিট পরপর এরকম ঘটতে পারে এবং সে রকম সময়ে আমাদের মস্তিষ্ক স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সুতরাং কেউ যদি আরইএম পর্যাq েঘুম থেকে জেগে ওঠেন, তারা তাদের স্বপ্নগুলো বেশি ভালোভাবে মনে রাখতে পারেন। এই মহামারির ক্ষেত্রে স্বপ্ন একটি আবেগি প্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের হিসাবে দুঃস্বপ্ন দেখেছেন, এরকম তথ্য দেওয়া মানুষের সংখ্যা সম্প্রতি অনেক বেড়ে গেছে।
মনে হতে পারে যেন এই মহামারির সময়ে সবাই শুধু নেতিবাচক স্বপ্নই দেখছেন। কিন্তু সেটা পুরোপুরি সত্যি নয়। শুনতে অবাক শোনাতে পারে, কিন্তু অনেক মানুষ এই সময়ে বেশ ইতিবাচক স্বপ্নও দেখছেন। অনেক মানুষ স্বপ্নে ভবিষ্যত্ দেখতে পেয়েছেন, যেখানে বর্তমান দূষণ নেই অথবা কেউ কেউ স্বপ্নে করোনা ভাইরাসের ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। এই ইতিবাচক স্বপ্ন দেখাদের একজন ভারতের নিউ দিল্লির নেরু মালহোত্রা। লকডাউন শুরু হওয়ার পর, আমি চমত্কার সব হোটেল রুম স্বপ্নে দেখতে শুরু করলাম। এগুলো এর আগে আমি শুধু টেলিভিশন পর্দাতেই দেখেছি।
ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, আপনি যদি চিন্তা করে থাকেন যে, কীভাবে স্বপ্নকে আরো বেশি শান্তিপূর্ণ করে তোলা যায়, তাহলে ঘুমের চাষাবাদ করতে হবে। আপনি যখন ঘুমিয়ে পড়তে শুরু করবেন, তখন আপনি নিজেকে নিজে পরামর্শ দিতে পারেন যে, কী ধরনের স্বপ্ন আপনি দেখতে চান। আপনি যখন ঘুমিয়ে পড়তে থাকবেন, তখন এই কৌশল এক আরামদায়ক অনুভূতি তৈরি করবে এবং আপনার ঘুমন্ত মন আপনার সেই অনুরোধ রাখার চেষ্টা করবে। —বিবিসি