লকডাউন বনাম হার্ড ইমিউনিটি :কোন পথে বাংলাদেশ

আসিফ হাসান রাজু

গোটা বিশ্ব আজ করোনার থাবায় অচল। বিশ্বের এ অচলাবস্থা কবে কাটবে তা অনিশ্চিত। ফলে অর্থনীতির চাকা সচল করতে কী করা যায়, আবার এ মহামারির হাত থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায়—সেই পথ খুঁজতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে বিশ্ব। করোনার জেরে লকডাউন বহু দেশ, মানুষের সাধারণ জীবনযাপন আজ বিপন্ন। গবেষকদের ধারণায় করোনা আক্রমণ করছে বেশি তাদেরকেই, যাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউনিটি সিস্টেম কম। বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানীরা দুটি দলে বিভক্ত, যেখানে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দুই বৈজ্ঞানিক দল দুটি আলাদা অস্ত্রের কথা বলছে।

একদল বলে বাড়িতে থাকুন। অর্থাত্, লকডাউনের ওপর জোর দিচ্ছেন। অন্য দল বলে বাড়ি থেকে বের হও। বাড়িতে থাকলে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। তবে জনগণ বাড়ি থেকে বের হলে নাকি বের না-হলে সংক্রমণটি তাদের ধরে ফেলে—এ আশঙ্কা দূর করা যাচ্ছে না। সুতরাং এর থেকে লুকিয়ে থাকার চেয়ে মুখোমুখি হোন। এতে লোকেরা যত বেশি সংক্রমিত হবে, মানবদেহ এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করার জন্য এটি আরো শক্তি তৈরি করবে। একে বলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’। অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বকে করোনা ভাইরাস এড়াতে এই হার্ড ইমিউনিটি গ্রহণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশ লকডাউন পদ্ধতিকে বেছে নিলেও স্রোতের বিপরীতে গিয়ে হার্ড ইমিউনিটি পদ্ধতি গ্রহণ করতে দেখা গেছে সুইডেন, নিউজিল্যান্ডসহ প্রথম দিকে যুক্তরাজ্যকে। তবে আমাদের দেশের মতো ঘনবসতি, জনবহুল দেশে এই পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে তা কিন্তু অনুমেয়। যদি অধিক হারে সংক্রমণ ঘটে, তাহলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা কি সম্ভব হবে? সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। সাম্প্রতিক সময়ে কলকারখানা সীমিত আকারে খুলে দেওয়া, আবার ঢাকার রেস্তোরাঁ খুলে দেওয়া, ঢিলেঢালা লকডাউন—এসব কী ইঙ্গিত দেয়, আমরাও কি হার্ড ইমিউনিটি পদ্ধতির দিকেই হাঁটছি? করোনা মহামারি শুরুর পর প্রায় ৫০০ জনের অধিক গবেষক লিখিত আকারে জানিয়েছিল এই হার্ড ইমিউনিটির পথ কতটা ভয়ংকর হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে আরেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ‘হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তুলতে মোট জনসংখ্যার ৬০-৭০ শতাংশ মানুষকে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হতে হবে।’ ফলে এটা সহজে অনুমেয় এই পথটি সহজ কোনো পথ নয়। বিভিন্ন দেশ এ মহামারির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন উপায় বেছে নিচ্ছে। ফলে তাদের সিদ্ধান্তগুলোও আলাদা। উদাহরণস্বরূপ যদি উন্নত রাষ্ট্র সুইডেন, কানাডা কিংবা নিউজিল্যান্ডের কথা বলি তার সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থাকে মেলানো কোনোভাবেই যুক্তিসংগত হবে না। কেননা, আমরা যদি সুইডেনের জনসংখ্যা এবং সেখানে বসবাসের ঘনত্ব দেখি তাহলে দেখা যায়, সুইডেনের মোট জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি। আর প্রতি বর্গকিলোমিটারে সেখানে মাত্র ২৫ জন লোক বসবাস করে। পক্ষান্তরে, আমাদের দেশে প্রায় ১৭ কোটির বেশি লোক বসবাস করে। যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে হাজারের অধিক। ফলে সুইডেন লকডাউন শিথিল করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণ করে চলতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে এটি করা অসম্ভবপ্রায়। এছাড়া উন্নত রাষ্ট্রকে হুবহু অনুসরণ করাও যুক্তিগত নয়। ফলে সরকারের উচিত হবে নিজেদের সম্পদ ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

n লেখক:শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়