করোনাকালে পৃথিবী

আফসানা রিজয়ানা সুলতানা

পৃথিবীর সর্বাধিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসারণকারী গ্যাস চীনে লকডাউনের ফলে পূর্বের তুলনায় সেখানে কার্বন নিঃসারণের পরিমাণ কমেছে প্রায় ২৫ শতাংশ। চীনের শহরগুলোতে বেড়েছে ভালো বাতাসের মান। এমনকি দূষণের শহর ঢাকা যেখানে শব্দের মাত্রা থাকে প্রায় ১১০-১২০ ডেসিবল সেটা চলে এসেছে মানুষের শ্রাব্যসীমার মধ্যে। পৃথিবীর সর্বাধিক বায়ুদূষণের দেশগুলোর তালিকায় বিগত কয়েক বছর ধরে শীর্ষে স্থান করে নেওয়া ঢাকা এখন ২৩ নম্বরে বলে জানিয়েছে বায়ু নিয়ে গবেষণাকারী সংস্থা ‘এয়ার ভিজ্যুয়াল’।

পৃথিবীতে যত কার্বন নিঃসারণ ঘটে তার এক চতুর্থাংশই ঘটে পরিবহনের কারণে। প্রতিদিন প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মানুষ পৃথিবীব্যাপী বাস, ট্রেন, বিমান, স্টিমার ইত্যাদির মাধ্যমে যাতায়াত করে থাকে। এসব যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ ঘটায়। মানুষের চলাচল সীমিত হওয়ায় পরিবহনের কারণে বায়ু দূষণ হচ্ছে খুবই কম। প্রতিদিন বিশ্বের কোথাও না কোথাও কোনো না কোনো দেশ দুর্বল দেশগুলোকে আক্রমণ করে চলছে। করোনাকালে থমকে আছে মানুষের সেই ভয়াবহ নৃশংসতা। নেই কোনো ভারী অস্ত্রের ব্যবহার, থেমে আছে যুদ্ধবিমানের গর্জন। যুদ্ধে ব্যবহূত ভারী অস্ত্রশস্ত্র, বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র শুধু যে পরিবেশের দূষণ ঘটায় তা-ই নয়, পৃথিবীপৃষ্ঠে মারাত্মক কম্পনেরও সৃষ্টি করে, যার পরিণতি সদূরপ্রসারী।

এটা আমাদের সকলের জানা যে, প্রতিনিয়ত অধিক মাত্রায় কার্বন নিঃসারণের কারণে আমাদের ওজোনস্তর ক্ষয় হয়ে চলছে। শুধু যে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমনের কারণেই ওজোনস্তর ক্ষয় হয়ে চলছে তা কিন্তু নয় এয়ারক্রাফট, মিসাইল, স্যাটেলাইট এবং এ ধরনের আরো অনেক কর্মকাণ্ড ওজোনস্তর ধ্বংসের জন্য দায়ী। ওজোনস্তর ধ্বংসের ফলাফল স্বরূপ সূর্যের অতিক্ষতিকর বেগুনিরশ্মি পৃথিবীতে প্রবেশ করছে। যার ফলে প্রতিনিয়ত পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে চলছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পৃথিবী। গলে যাচ্ছে আর্কটিক ও অ্যান্টার্টিক অঞ্চলের বরফ। গবেষকরা জানিয়েছেন, মেরু অঞ্চল, তুন্দ্রা অঞ্চল, সাইবেরিয়া, আলাস্কা ও গ্রিনল্যান্ডের অঞ্চলের বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে আদিম সব ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগজীবাণু। বরফ গলে যাওয়ার ফলে এগুলো মুক্ত হয়ে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ছে আর মহামারির রূপ নিচ্ছে। যার ফলে নতুন নতুন রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ যার প্রতিকারের উপায় চিকিত্সা বিজ্ঞানীদের অজানা। ঠিক এভাবেই ২০১৬ সালে রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল অ্যানথ্রাক্স রোগ। প্রথমেই ১২ বছরের একটি শিশু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করে। পরে বিজ্ঞানীরা এ রোগের উত্স খুঁজতে গিয়ে জানতে পারেন, ৭৫ বছর আগে মারা যাওয়া একটি বলগা হরিণ থেকে রোগটি ছড়িয়েছিল। তাই এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পৃথিবী জুড়ে মানুষ যেসব কর্মকাণ্ড করে চলছে তাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের রোগের প্রকোপ আরো বৃদ্ধি পাবে।

এছাড়া সংকট পরবর্তী সময়েও প্রতি বছর কিছু সময়ের জন্য বিশ্বকে লকডাউনে রাখা যায় কি না সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে। ইতিমধ্যে এমন দাবি তুলেছেন গ্রিস পরিবেশবিদ ক্রিসটোস জেফরোস। অন্তত লকডাউনে রাখা সম্ভব না হলেও যে কাজগুলো বা সেমিনার, সভা ঘরে বসে অনলাইনে করা সম্ভব সেগুলো অনলাইনে করা যেতে পারে। এতে করে পরিবহনের ওপর চাপ কমবে। পরিবেশ দূষণের পরিমাণ কমে আসবে। আশা করি, বিশ্ব সম্প্রদায় এ বিষয়ে একটি যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কবি সুকান্তের ছাড়পত্র কবিতার লাইন দুটি আজকের সময়ে খুবই প্রাসাঙ্গিক, ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’

n লেখক:শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়