ম তা ম ত
সৈয়দ আলমাস কবীর
বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানব জাতির জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন এসেছে। মানুষ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে, বাসা থেকে কাজ করা শুরু করেছে, পরিবারে আরও বেশি সময় দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং ব্যবসায়ীক কার্যক্রম কমিয়ে দিচ্ছে। জীবনযাপনের এ পরিবর্তন করোনা পরবর্তী বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।
জনমনে ভয়, এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ভিন্ন বিশ্ব তৈরি হবে। হোম অফিস ধারনাটি করোনা মহামারীর পরবর্তী বিশ্বের স্থায়ী অনুশীলন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের বাড়ি থেকে আরও বেশি কাজ করার জন্য উত্সাহিত করবে। এ পদ্ধতি শুধু অফিস স্পেস-এর উপরেই চাপ কমাবে না, ইউটিলিটি বিল ও অন্যান্য বিষয়েও সাশ্রয়ী হবে। এর একটি বিশাল ভালো দিক হচ্ছে, এই টেলিকমিউটিং ট্রাফিক যানজট ও বায়ু দূষণ অনেক হ্রাস করবে। পারিবারিক সম্পর্ক উন্নয়নে সামাজিক রীতির পরিবর্তন ঘটবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলকে কর্মপোযোগী করতে দেশব্যপী ইন্টারনেট ব্যবস্থা আরও জোড়দার হবে। ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেম ও সহযোগী সরঞ্জামগুলোর নতুন বৈশিষ্ট্যগুলোর বিন্যাস দেখতে পাওয়া যাবে। মিটিংয়ের মান পরিবর্তন হবে। কোভিড-১৯ পরবর্তী সমাজে অনেক অনলাইন কোর্স দেখতে পাওয়া যাবে। শিক্ষার্থীরা যেখানেই থাকুক সেখান থেকে ডিজিটাল ক্লাসরুমে অংশগ্রহণ করতে পারবে। অনলাইন কোর্সে পূর্বে ধারনকৃত বক্তৃতাগুলো শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে নতুন গতি যুক্ত করবে। মূল্যায়ণ বা পরীক্ষা পদ্ধতিতেও একটি বড় পরিবর্তন দেখা যাবে। এতে একজন পরীক্ষার্থী বই বা নোট খোলা রাখতে পারবে, তবে তার মেধা ব্যবহার করেই উত্তর দিতে হবে।
টু-ডি ও থ্রি-ডি এনিমেশনে দক্ষ পেশাদারদের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। অনলাইন কোর্সের জন্য আরও বেশি ডিজিটাল বিষয়বস্তুর প্রয়োজন হবে। ভিডিও এডিটিং ও মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামাদির চাহিদা নতুনভাবে বাড়বে। আগামীতে ডিজিটাল গ্রাফিক্স ও এডিটিংয়ে দক্ষদের চাহিদাও বাড়বে। গৃহস্থলী অ্যাপলায়েন্স, মোটরযান, মেশিনারিজ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও বিনোদনসহ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)-এর প্রয়োগ হবে সর্বব্যাপী। সঙ্গে সঙ্গে এপ্লিকেশনের চাহিদাও বাড়বে। ব্যবসায়ে দক্ষতা বৃদ্ধি ও ব্যয় কমাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে। ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), বিগ ডাটা ও এআই প্রযুক্তি একসঙ্গে কারখানা ও আবহাওয়া বা পরিবেশ নিরিক্ষণের কাজেও ব্যবহার করা হবে। এ জাতীয় এপ্লিকেশনগুলো ব্যবহারের ফলে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে আরও কার্যকর সতর্ক-ব্যবস্থা তৈরি হবে, যা আগামীর জন্য আমাদের আরও প্রস্তুত করে তুলবে।
ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর ব্যবসায় ছোট হয়ে আসবে। অনলাইন ভ্রমণ সাইটগুলো করোনা লকডাউন চলাকালীন সময়ের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে না, যদি তারা তাদের প্যাকেজগুলো বৈচিত্র্যময় ও কাস্টমাইজ করে সরবরাহ না করে। বড় বড় হোটেল ও আতিথেয়তা শিল্পেও মন্দা দেখা দিবে। যদিও ছোট ছোট হোটেলগুলো পর্যটন শিল্পের এই পবিবর্তনের ভালো সুযোগ নিতে পারবে।
স্বাস্থ্যখাতে একটি বৃহত্ পরিবর্তন আসবে। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বর্তমান প্রস্তুতিহীনতা সংশ্লিষ্ট মহলকে এ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাবে। ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিকস ও প্রশাসনের সাথে যুক্তরা করোনা পরবর্তী সময়ে অধিকতর সতর্ক থাকবেন। বিশ্বের সকল দেশই স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের জন্য বার্ষিক বাজেটের একটি ভালো অংশ নির্ধারিত রাখবে। বড় বড় করপোরেট ও সমাজসেবীরা হাসপাতাল তৈরি করতে এগিয়ে আসবেন। স্বাস্থ্য-সেবারকর্মীদের চাহিদা বাড়তে দেখা যাবে। আমাদের দেশে ডাক্তার-রোগী অথবা রোগী-নার্সের অনুপাত বেশ দূর্বল। এখানে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র তিনজন ডাক্তার ও একজন নার্স রয়েছে। নার্সিং পেশার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে ও একটি চাহিদাজনক পেশা হয়ে উঠবে। স্বাস্থ্যসেবার সরঞ্জাম উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা ও উন্নয়নে আরও বেশি করে বিনিয়োগ করবে এবং স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমানোর সমাধান নিয়ে আসবে। হাসপাতালগুলো রোগীদের অসুস্থতা চিহ্নিতকরণে আধুনিক সরঞ্জামে বিনিয়োগ বাড়াবে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবায় আসবে আমুল পরিবর্তন। মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি ফোনে বা কম্পিউটারের মাধ্যমে ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিত্সা নেবে। হাসপাতালে বা চেম্বারে আগের মতো রোগীদের ভিড় দেখা যাবে না। তারা ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে চিকিত্সকদের কাছ থেকে ভার্চুয়াল পরামর্শ নেবে। ওষুধ সরবরাহেও একটি নতুন দিগন্ত দেখা যাবে। ফার্মেসিগুলোতে তেমন ভিড় দেখা যাবে না কারণ, মানুষ ঘরে বসে ওষুধ গ্রহণ করতে আগ্রহী হবে।
কভিড-১৯ পরবর্তী সমাজে বিনোদন শিল্পের বিকাশ ঘটবে। যদিও থিয়েটার ও সিনেমা হলগুলো আগের মতো হয়তো জনপ্রিয় থাকবে না। অনলাইন স্ট্রিমিং হবে নতুন স্ট্যান্ডার্ড। সবাই পাবলিক প্লেস এড়িয়ে চলতে চাইবে, ফলে টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা আবারও ফিরে আসতে পারে। ইন্টারএক্টিভ মুভি ও ইন্টারনেট গেমগুলো বিনোদন শিল্পকে নতুনভাবে দখল করবে।
কেটাকাটার অভিজ্ঞতায় আসবে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। ক্রেতারা বেশি বেশি করে অনলাইনে কেনাকাটা করতে থাকবে। অনলাইনে পণ্যের বাস্তবতা বাড়ানোর জন্য হলোগ্রাম প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে। পণ্য সরবরাহে ড্রোন ও রোবট অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কুরিয়ার কোম্পানিগুলো এধরনের যন্ত্রপাতি আরও বেশি স্থাপন করবে। কোভিড-১৯ এর পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে যোগাযোগহীন লেনদেন ব্যবস্থা এক নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।
কোভিড-১৯ সংক্রমণটি আমাদের জীবনযাত্রা ও কাজের অভ্যাসকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তবে চ্যালেঞ্জ আমাদের আরও সৃজনশীল করে তুলবে। ‘প্রয়োজনীয়তা আবিষ্কারের জননী’, এই প্রবাদটির ফলাফল আমরা আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে দেখতে পাবো। আমি আন্তরিকভাবে আশাবাদী যে, করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করতে গিয়ে আমরা যা যা শিখছি, তা আগামীর জন্য একটি সুন্দর বিশ্ব তৈরিতে আমাদের সহায়তা করবে।
লেখক :প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)