বিশ্ব পরিবর্তনের আরেক ধাপ

পৃথিবীতে আমরা বারবার পরিবর্তন আসিতে দেখিয়াছি—নূতন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হইতে দেখিয়াছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই সারা বিশ্বের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তাহার মধ্যে প্রধান দুইটি পরিবর্তন হইল, ইউরোপের দেশগুলি এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপনিবেশগুলি ছাড়িয়া যাইতে বাধ্য হয়। ইহার সহিত ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন নামক দুইটি নূতন পরাশক্তির জন্ম হয়। গোটা বিশ্বে তখন হইতেই শীতল যুদ্ধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রক্সি ওয়ার সংঘটিত হইতে দেখিয়াছি। বত্সরের পর বত্সর এই দুই শিবিরের যুদ্ধংদেহি অবস্থানের কারণে বহু দেশকে রক্ত দিতে হইয়াছে, ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করিতে হইয়াছে। অবশেষে ১৯৮৯-৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙিয়া গেলে আরেকটি নূতন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। প্রায় একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে অনুসরণ করিয়া বেশ কয়েকটি দেশ সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করিয়া গণতন্ত্রে প্রবেশ করে। দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগঠনগুলি দুর্বল হইয়া পড়ে। ইহার পর আমরা ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর আরেকটি নূতন বিশ্বে প্রবেশ করি। নূতন ওয়ার্ল্ড অর্ডার। তখন বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশ প্রায় একক ক্ষমতাশালী যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার সহযোগী ইউরোপীয় দেশগুলির রোষানলে পড়ে। আফগানিস্তান, ইরাক সরাসরি আক্রমণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী দল গঠিত হয়, যাহারা নিজেদের ইসলামি বলিয়া দাবি করে। বহু দেশে বহু নিরীহ মানুষ তাহাদের হাতে নিহত হয়। একপর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যে দেখা দেয় আরব বসন্ত, যাহার ফলে দেশে দেশে আসে শাসনক্ষমতায় পরিবর্তন; কিন্তু বিশ্ব যখন আবার একটু  রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে পা বাড়াইতেছিল, তখন ২০১৬ সালে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভালো বা মন্দ যাহাই হউক, তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর বিশ্ব আরেকটি নূতন রূপ দেখিতে পাইয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের, যাহা কাহারো নিকট প্রত্যাশিত ছিল না। হউক তাহা অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে অথবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে বিশ্বে নূতন অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হইয়াছে চীন; সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব লইয়া আবির্ভূত হয় ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া, যাহার ফলে আমাদের সম্মুখে আরো একটি নূতন বিশ্বব্যবস্থা আগাইয়া আসিতে থাকে। এই ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের হাত ধরিয়া সামরিক দ্বন্দ্ব দিনে দিনে অধিকমাত্রায় আত্মপ্রকাশ করিতে থাকে, যাহার প্রভাব পড়িতে থাকে প্রায় প্রতিটি দেশে। 

ইহার পরই বিশ্ব কাঁপাইয়া আসিয়াছে করোনা ভাইরাস নামক মহামারি। এই মহামারি বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পালটাইয়া দিবে বলিয়াই মনে করিতেছেন বিজ্ঞজনেরা। তৈরি করিবে নূতন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। অর্থনীতিবিদরা জানাইয়াছেন, ইতিমধ্যেই বিশ্বের ২৫০ কোটি মানুষ বেকরত্বের হুমকির মধ্যে পড়িয়াছে। বিশ্বের বড়ো বড়ো কোম্পানির কোনোটিতে কর্মী ছাঁটাই এবং কোনোটি লে-অফ ঘোষণা করিতে বাধ্য হইতেছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না—নূতন এই বিশ্বব্যবস্থা হইতে বাংলাদেশেরও পরিত্রাণ পাইবার সুযোগ নাই। তাই সরকার, ছোটো-বড়ো ব্যবসায়ী, কর্মী—সকলকেই সাবধানে সম্মুখে পা বাড়াইতে হইবে।