দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
বিশ্বের এক বিশালসংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত। লাখ লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছে। রোজ মৃত্যু হচ্ছে। এ রোগের কোনো ওষুধ নেই। কোথায় এর উত্স, কবে এই মহামারির অবসান হবে কেউ তা জানে না। রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে কেউ সাহায্য জোগাবে তারও উপায় নেই। এই ভাইরাস এতটাই সংক্রামক যে, মানুষ এখন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ও গৃহবন্দি। এই বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর মিছিলের মধ্যে তাহলে মানুষের বেঁচে থাকার উপায় কী? মনীষীরা বলছেন, একটি মাত্র উপায় মানুষের মনে আশা জাগানো, সাহস জাগানো।
কোবিড-১৯ এর একমাত্র ওষুধ এখন সাহস। এই বিশ্বাস বুকে পুষে রাখা, আমি মরব, তুমি মরবে, কিন্তু মানুষের মৃত্যু নেই। মানবতা অমর। কিন্তু কে এই বিশ্বাস ও সাহস মানুষের মনে জাগাতে পারে? মহাত্ম গান্ধী একবার বলেছিলেন, ‘যে এই সাহস ও বিশ্বাস নিজে অর্জন করতে পেরেছে, সেই পারে এই সাহস ও বিশ্বাস আরো হাজার জনের মনে রোপণ করে দিতে।’
এই কথাটা যে কত সত্য, তা এবার প্রমাণ করলেন করোনায় এই বিশ্বগ্রাসী হামলার সময়ে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ল্ডনে যখন বৃষ্টিপাতের মতো হিটলারের ভি রকেট পড়ছে, তখন তরুণী রাজকুমারী এলিজাবেথ স্বেচ্ছাসেবিকা হয়ে যুদ্ধাহতদের মধ্যে কাজ করেছেন। এখন তিনি লিলিবেথ।
এখন তার বয়স নম্বইয়ের ওপরে। জরাজীর্ণ শরীর। তার প্রধানমন্ত্রীকে করোনা আক্রমণ করেছে। ডাক্তারদের মতে তিনিও আছেন বয়সের দরুন হাইরিক্সের মধ্যে। তথাপি তিনি নিয়মিত রাজকার্য চালাচ্ছেন। তারপর জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ দিয়েছেন। যে ভাষণের একটি কথা সারা বিশ্বের মানুষের মনে মৃত্যু জয়ের সাহস জুগিয়েছে। এলিজাবেথ আবেগপ্রবণ কণ্ঠে বলেছেন, ‘উই উইল মিট এগেইন’ আমাদের আবার দেখা হবে। এই কথাটা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মনে আশা, বিশ্বাস ও সাহসের আগুনের ফুলকির মতো। এই একটি কথা মানুষের মনে এই বিশ্বাসই জাগিয়ে তুলেছে যে, মৃত্যু পরাজিত হবেই। মানবতা অপরাজেয়।
কুইন এলিজাবেথ যেন কবি লিলিবেথ। তার কবিতার কলিই যেন ফুল হয়ে ফুটেছে বাংলাদেশের এক তরুণ কবি অপূর্ব শর্মার কবিতাতেও। তা আবৃত্তি করে সর্বত্র ছড়াবার দায়িত্ব নিয়েছেন কয়েকজন আবৃত্তি শিল্পী।
‘আবারও দেখা হবে, ঠিক যেমনভাবে দেখা হতো,/ আবারও কথা হবে ফেলে আসা দিনের মতো। /দেখা হবে জাগরণে, দেখা হবে স্লোগানে /আবারও দেখা হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, /দেখা হবে আন্দোলনে, দেখা হবে সংগ্রামে/ দেখা হবে প্রেরণার চিরচেনা সমভূমে।/ দেখা হোক বার বার, থাকে যেন মিলেমিশে/ দেখা হবে দেশপ্রেমে, দেশকে আবার ভালোবেসে।’
কবি লিলিবেথের ‘উই উইল মিট এগেইন’ দিয়ে গান লিখেছেন প্যারিসের একটি তরুণ গায়কগোষ্ঠী। শুনেছি, আমেরিকাতেও গান তৈরি হয়েছে ‘উই উইল মিট এগেইন।’ পল রবসন আজ বেঁচে থাকলে ঘরে আইসোলেশনে থেকেও এই গানে হয়তো আমেরিকার সাদা-কালো অধিকাংশ মানুষের মন থেকে করোনার আতঙ্ক তাড়াতেন।
ভয় ও আতঙ্কে সারা বিশ্বের মানুষ আজ দিশেহারা। মানুষের মন থেকে এই ভয়টা আগে তাড়াতে হবে। কুইন এলিজাবেথ তা করার সাহসী চেষ্টা করেছেন। আমাদের দেশে কি এমন কবি নেই, যারা করোনার বিরুদ্ধে কবিতা লিখতে পারেন, এমন গীতিকার নেই যিনি গান লিখতে পারেন, এমন শিল্পী নেই যারা ছবি আকতে পারেন? করোনার জন্য তারা ঘরে বসে থাকুন, কিন্তু অনলাইনে তাদের কবিতা, গান, ছবি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারেন। যাতে থাকবে সাহস ও আশাবাদের কথা। মৃত্যুর কাছে নতি স্বীকার না করার কথা। যাতে মানুষকে একথাই বোঝানো হবে ‘মৃত্যু সত্য, কিন্তু তার চাইতেও বড় সত্য মানবতার অমরত্ব।’
আজ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর মানুষের মনে সাহস ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার সঙ্গে তাদের জন্য কিছু বাস্তব সাহায্য প্রয়োজন। গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য অবশ্য ঝুঁকি নিয়েও লকডাউন তুলে দেওয়া হয়েছে। শহরের রাজপথে যানবাহন ও লোক চলাচল শুরু হয়েছে। কিন্তু মানুষের ঘরে খাদ্যের চাহিদা, এখনো যারা গরিব শ্রেণীর মানুষ লকডাউনে আছেন, তাদের খাদ্য, ওষুধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ দরকার। সরকার তাদের জন্য বহুমুখী সাহায্যের পরিকল্পনা নিয়েছেন । তার সঙ্গে বেসরকারি সাহায্য যুক্ত হওয়া দরকার।
করোনার পর অথবা সঙ্গে একটি মহাদুর্ভিক্ষ নাকি দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। বাংলাদেশে কৃষকের জমিতে এবার ফলন হয়েছে মোটামুটি ভালো। কিন্তু লকডাউন ও যানবাহন ব্যবস্থা বন্ধ রাখার দরুন আগের বছরগুলোর মতো কৃষিমজুরেরা হাওর এলাকায় বা অন্য জেলায় ধান কাটতে যেতে পারেননি। এখন অবশ্য যাচ্ছে। তার সঙ্গে বড়ো সুসংবাদ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগের নেতাকর্মীরা হাওর এলাকায় ও বিভিন্ন জেলায় গিয়ে জমির ধান কেটে এবং তা মাড়াই করে কৃষকের ঘরে তুলে দিচ্ছে। মে মাসের মধ্যে এই ধান কাটা শেষ করতে হবে। নইলে জুন মাসে বর্ষার মওসুম শুরু হলে খেতের ফসল নষ্ট হবে।
ইদানীং ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে কোনো ব্যাপারেই অভিনন্দন জানাতে পারিনি। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সঙ্গে জড়িত একশ্রেণীর নেতাকর্মীর কার্যকলাপে তাদের পক্ষে ভালো কিছু লেখা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। এখন মনে হয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ আবার তাদের আগের স্বেচ্ছাসেবী ও সংগ্রামী ভূমিকায় ফিরে যাচ্ছে। এজন্য ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নতুন নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানাই। তাদের কাছে আবেদন, তারা কৃষকদের সাহায্য দেওয়ার মতো করোনায় বিধ্বস্ত পরিবারগুলোর প্রাত্যহিক নানা সমস্যায় সাহায্য দেওয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবী স্কোয়াড তৈরি করুন এবং সমস্যাগ্রস্ত সাধারণ মানুষকে সাহায্য দানে এগিয়ে আসুন। অবশ্য এক্ষেত্রে তারা সরকারি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন কঠোরভাবে।
অসহায় মানুষের পাশে সাহায্যদাতাদের এসে দাঁড়ালেই তাদের মনে করোনার বিরুদ্ধে সাহস ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনবে। আমাদের পল রবসন নেই। কিন্তু ফকির আলমগীর এবং তার মতো সংগ্রামী লোকসংগীত শিল্পীরা রয়েছেন। তাদের কণ্ঠে করোনাবিরোধী গান অবশ্যই মানুষের মনোবল ফিরিয়ে আনবে। সরকারের তথ্য ও গণসংযোগ বিভাগের এদিকে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। এটা আরো দেওয়া উচিত এজন্য যে, ঢাকার ‘সময়’ টেলিভিশনের আজকের (২ মে) সকাল ১০টার (ঢাকা সময়) খবরে দেখলাম, মানুষ সরকারের বহু নির্দেশ মানছে না। তার মধ্যে রয়েছে রাজধানী ঢাকা শহরে আসা ও যাওয়া। এটা সরকারি আদেশে নিষিদ্ধ। কিন্তু মানছে না। তাতে বাংলাদেশে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ কমানো যাচ্ছে না।
‘সময়’ টেলিভিশনের সংবাদ পাঠক বলেছেন, ‘ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে লোক যাতায়াতের ব্যাপারে পুলিশের কঠোর নজরদারি থাকার কথা। গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত থাকলে পুলিশের এই নজরদারি থাকে। গণমাধ্যমের কর্মীরা সরে গেলেই পুলিশের নজরদারিও আর থাকে না।’ পুলিশকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাংলাদেশ গরিব মানুষের দেশ। মাসের পর মাস খেটেখাওয়া মানুষের লকডাউনে থাকা সম্ভব নয়। পুলিশও এটা বোঝে তারাও মানুষ। বাংলাদেশ কেন, লকডাউনে অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছে ব্রিটেন ও আমেরিকার মানুষও। নিউ ইয়র্কে এক ধর্মযাজকের মৃত্যুতে ২৫ হাজার মানুষ সরকারি আদেশ অমান্য করে তার শেষকৃত্যে যোগ দিয়েছে।
আইন করে মানুষকে দীর্ঘদিন ঘরে রাখা যায় না। যদিও এই আইনটা মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু কিছু মানুষ তা বুঝতে চায় না। আবার কিছু মানুষ বুঝতে পেরেও পেটের দায়ে এই আইন মানতে অপারগ। এজন্য কোনো ব্যাপরে মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারলে তাদের দ্বারা আইন মানাতে পাহারার দরকার হয় না। এখানেই আসে আমাদের চারণ কবি ও গায়কদের কথা। করোনা বিপদ সম্পর্কে তাদের দ্বারা গান বেঁধে তা চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশে করোনার বিপদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের চেতনা বাড়াতে পারলে সরকারি আইন মানতে পুলিশ পাহারার তেমন প্রয়োজন হবে না।
ব্রিটিশ আমলের অবিভক্ত বাংলাদেশে ১৯৪৬ সালে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ যখন বরিশাল, নোয়াখালীতেও ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন বয়সে আমি কিশোর। তখন চারণ কবি ও গায়কদের এই দাঙ্গা থামানোর ভূমিকা দেখেছি। কমিউনিস্ট পার্টি তখন ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম (কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পরই) রাজনৈতিক দল। তাদের ছাত্রফ্রন্ট ও সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল দাঙ্গাবিরোধী ছোটো ছোটো স্কোয়াড। তাদের সঙ্গে থাকতো হিন্দু-মুসলমান চারণ কবি ও গায়কেরা। তারা গান গেয়ে দাঙ্গার বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে তুলেছেন। সেকালের একটি গানের কথা এখনো আমার মনে আছে।
‘ও ভাই হিন্দু ও ভাই মুসলমান/ তোমরা এক আল্লা এক ভগবানের সন্তান/ ভাইয়ের বুকে ছুরি ভাই হয়ে মেরোনা ভাই /তাহলে যে পাপ হবে তার কোনো তুলনা নাই/ ওই শোনো কান্দে দেশমাতা/ ওই শোনো কান্দে মানবতা/ ছুরি ফেলে ভাই ভাইয়ের সঙ্গে বুক মেলাও/ শয়তান দাঙ্গাবাজ দেশ ছেড়ে পালাও পালাও।
করোনা শিগগিরই কিংবা কোনো দিন একেবারে বিলুপ্ত হবে, তা আমার মনে হয় না। যক্ষ্মা, ক্যানসার, নিউমোনিয়ার মতো তা থেকে যাবে। তবে পুরোনো রোগের মতো নিয়ন্ত্রিত হবে। রোগ প্রতিষেধক বের হলে মৃত্যুভয়ও কমে যাবে। যতদিন তা না হয় ততদিন মানুষকে অবশ্যই এর বিরুদ্ধে সচেতন সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হবে। আশা ও বিশ্বাস হারিয়ে লাভ নেই। প্রার্থনা করি, এই দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে আল্লাহ শেখ হাসিনাকে তওফিক দিন।
n লন্ডন, ২ মে শনিবার, ২০২০