মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বরিশালের ‘মুড়ি গ্রামের’ বাসিন্দারা

রমজান মাস এলেই মহাব্যস্ত হয়ে ওঠেন নগরসংলগ্ন নলছিটি উপজেলার তিমিরকাঠী, ভরতকাঠী ও বাকেরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম চরামি গ্রামের মানুষ। এ তিন গ্রামের তিন শতাধিক পরিবারই মুড়ি ভাজা ও তা বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বলে গ্রামগুলো পরিচিতি পেয়েছে মুড়ি গ্রাম নামে। যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় তারা ধরে রেখেছেন এ পেশা। সারা বছর এ কাজেই তাদের সংসার চলে। রমজান মাস এলে কাজের চাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সকলেই মুড়ি ভাজার কাজে যুক্ত হন। মেঘ-বৃষ্টির মধ্যে মুড়ির ধান শুকিয়ে সেদ্ধ করে চলছে এ কর্মযজ্ঞ। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে এ সময়টাতে বাড়তি কাজ করে যোগান ঠিক রাখতে হচ্ছে গ্রামবাসীর। প্রতি বছরের চেয়ে এবার করোনার কারণে কেজিপ্রতি পাইকারিতে ১০ টাকা এবং খুচরায় ২০ থেকে ২৫ টাকা দাম বেড়েছে হাতে ভাজা মুড়ির।

নগরসংলগ্ন আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতু পার হলেই দপদপিয়া ইউনিয়নের তিমিরকাঠী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে—সকলেই মুড়ি ভাজা নিয়ে ব্যস্ত। মাটির হাঁড়ি পাতিলের টুং-টাং শব্দ। কেউ ব্যস্ত আবার সেগুলো বস্তাভর্তি করতে। এ মুড়ি শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, সারা দেশের রোজাদারদের কাছে ইফতারির প্রধান রসদ। গ্রামবাসী জানায়, তিমিরকাঠী গ্রামের দেড়শ পরিবারের অধিক মুড়ি ভাজা পেশার সঙ্গে জড়িত। একেকটি পরিবার প্রতিদিন কমপক্ষে এক মণ চালের মুড়ি ভাজতে পারে। তিমিরকাঠী থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরবর্তী বাকেরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম চরাদি গ্রামে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। সেখানকার কলবাড়ি ও হাজি বাড়ির প্রায় শতাধিক পরিবার মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এসব গ্রামের লোকজন জানায়, রমজান মাসকে কেন্দ্র করে গত সপ্তাহ থেকে দৈনিক হাজার মণ পর্যন্ত মুড়ি সরবরাহ করা হচ্ছে। রমজান জুড়েই এ চাহিদা থাকে। ইউরিয়া সারের ব্যবহার ছাড়া, হাতে ভাজা এ মুড়ি স্বাদে অতুলনীয়। তাই মেশিনে ভাজা মুড়ির চেয়ে হাতে ভাজা মুড়ি মানুষের কাছে বেশি প্রিয়। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিমিরকাঠীতে একটি ও ভরতকাঠীতে দুটি মেশিনে মুড়ি ভেজে তাও দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। সাধারণত মেশিনে ভাজা মুড়ি সাদা ও আকর্ষণীয় হয়ে থাকে।

বংশ পরম্পরায় মুড়ির গ্রাম তিমিরকাঠীর প্রবীণ জলি হাওলাদার জানান, এক সময় দেশের অন্য দশটা গ্রামের মতোই এ গ্রামের গৃহস্থরা নিজেদের পরিবারের প্রয়োজন মতো মুড়ি ভাজতেন। ১৯৪৮ সালে পার্শ্ববর্তী গ্রাম ঝুরকাঠির বাসিন্দা আমজেদ মুড়ি ভেজে তা বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেন। তার দেখাদেখি তিমিরকাঠীর আরো কয়েকটি পরিবার তাদের সংসারের আয় বাড়াতে মুড়ি ভেজে বিক্রি শুরু করে। গ্রামের বেশ কিছু মানুষ মুড়ি ভেজেই তাদের সংসার চালাতে শুরু করে। বিগত শতাব্দীর আশির দশকে আব্দুল হক নামের এক বিএসসি শিক্ষক বিভিন্ন স্থানের পাইকারদের মুড়ি  কেনার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এ গ্রামে নিয়ে আসেন। এরপরই কদর বাড়তে থাকে তিমিরকাঠী গ্রামের মুড়ির।

বাণিজ্যিকভাবে মুড়ি ভাজার সঙ্গে তিন যুগ ধরে জড়িত তিমিরকাঠীর ভূইয়া বাড়ির ৪০টি ঘরের সবাই মুড়ি ভাজার পেশায় নিয়োজিত। শুধু ভূইয়া বাড়ি নয়, এ গ্রামের প্রত্যেক ঘরের মানুষ ও দক্ষিণ চরাদিতে গত এক মাস ধরে দিনরাত ব্যস্ত মুড়ি ভাজার কাজে। উনুনের জ্বালের কাছে থাকতে হয় বলে দুই জন অথবা চার জন শ্রমিক পালা করে বিশ্রাম নিয়ে নির্বিঘ্নে চুলায় তাপ দিয়ে অবিরাম মুড়ি ভেজে যাচ্ছেন। শ্রমিকরা বিশ্রাম নিলেও মুড়ির চুলার কোনো বিশ্রাম নেই। দৈনিক গড়ে ৫০ কেজি মুড়ি ভাজতে পারলে খরচ বাদ দিয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাভ হয়। তবে নিজেরা ধান কিনে মুড়ি ভেজে শহরে নিয়ে বিক্রি করলে লাভ বেশি। তাই স্বল্প পুঁজির মানুষ রমজান মাসে মুড়ি ভেজে কমপক্ষে ৫০ হাজার ও বড়ো একান্নবর্তী পরিবারগুলো লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। পাইকাররা প্রতি কেজি মুড়ি এ বছর ১০০ টাকা দরে কিনে খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা।