প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শতবর্ষ পরে

বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী। অর্থাত্ সূচের অগ্রভাগে যতটুকু জমি ধরা পড়ে, ততটুকুও বিনা যুদ্ধে ছাড়িতে চান নাই কুরু যুবরাজ দুর্যোধন। যুগে যুগে পৃথিবীতে যুদ্ধের যে ভয়ঙ্কর দামামা বাজিতে দেখা গিয়াছে, তাহা যেন সভ্যতা বিকাশেরই বাইপ্রডাক্ট। যুদ্ধ বহুক্ষেত্রেই বিপ্লবের পরিপূরক। বড় বড় যুদ্ধের পর এক একটি জনপদ চিরকালের মতো পাল্টাইয়া যায়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তেমনই ব্যাপক একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয় ইউরোপ জুুড়িয়া, যাহার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব অনতিবিলম্বে ছড়াইয়া পড়ে বিশ্বব্যাপী। সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্ত্র সংবরণের একশত বত্সর পূর্ণ হইল গত ১১ নভেম্বর। বস্তুত, উহা ছিল এক ধরনের যুদ্ধবিরতি। ওই প্রথম যুদ্ধের গর্ভেই বাড়িয়া উঠিতেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভ্রূণ।

প্রাচীন সভ্যতার উত্থান-পতন হইতে শুরু করিয়া আধুনিক ইতিহাসের বিংশ শতাব্দীর প্রথমাংশ অবধি  যত যুদ্ধ হইয়াছে, তাহার সবকিছুকে ছাড়াইয়া গিয়াছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি। সামরিক-বেসামরিক মিলাইয়া প্রায় ৩ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ হতাহত হইয়াছে। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরির সেনাবাহিনী, সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজিয়া ওঠে। অস্ট্রিয়া আর হাঙ্গেরির বড় প্রতিবেশী জার্মানিও এই যুদ্ধের পক্ষ নেয়। অপর দিকে রাশিয়া, ফ্রান্স ও ব্রিটেন সার্বিয়ার পক্ষাবলম্বন করে। পর্যায়ক্রমে ইউরোপ হইয়া মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, পূর্ব এশিয়ার নানা দেশে ছড়াইয়া পড়ে এই যুদ্ধ। পরবর্তী সময়ে এই আগুনের হল্কা আটলান্টিক পার হইয়া মার্কিন মুল্লুকেও উত্তাপ ছড়ায়। চার বত্সরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইহার অবসান হয় ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর। কিন্তু কী কারণে সংঘটিত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ? ইহার নেপথ্যে ছিল সেই সময়কার ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ, অর্থনীতি, গোপন চুক্তি, ত্রিশক্তিসহ বিবিধ কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইউরোপের কিছু দেশ আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকাতে নিজ নিজ কলোনি স্থাপন করিয়া ফেলিয়াছিল। ব্রিটেন ও ফ্রান্স অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকিলেও জার্মানি দিন দিন আগাইয়া যাইতেছিল। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পাশে নূতন আরেকটি শক্তির আগমন ঘটিতে থাকে। এইক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব ছিল অনিবার্য।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৪৫ সালে উহা শেষ হইবার পর মানবতাবাদের পক্ষে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কণ্ঠ মিলাইতে থাকে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ। গঠন করা হয় জাতিসংঘ। কিন্তু আমরা এখনো দেখিতে পাই পরাশক্তিদের রেষারেষি। জাতিসংঘ পরিণত হয় আড্ডাস্থলে। এই কারণে জাতিসংঘকে পাশ কাটাইয়া অন্যরাষ্ট্রের উপর আক্রমণে দ্বিধা করে না কোনো কোনো পরাশক্তি। সুতরাং প্যারিসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্ত্রসংবরণের শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ষাটের অধিক রাষ্ট্রপ্রধান মিলিত হইবার ঘটনাটি বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। এই অনুষ্ঠানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলিলেন, দেশপ্রেমের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াই জাতীয়তাবাদ উঠিয়া আসে। তিনি মনে করেন, ওই অশুভ শক্তি ফের মৃত্যুমিছিল তৈরি করিতে চাহে, অশান্তি পাকাইতে চাহে। ইতিহাস কখনও সখনও তাহার দানবিক ঘটনাপ্রবাহকে ফিরাইয়া আনিতে চাহে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আদলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ত দেখা দিবে না, কিন্তু এখন বিশ্বব্যাপী যাহা চলিতেছে তাহা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়া নহে? কোথায় স্বস্তি? কোথায় শান্তি? উহারা যেন কেবল কেতাবি শব্দ। এই অবস্থা হইতে পরিত্রাণ পাইতে নূতন দর্শন নূতন পথ খুঁজিয়া লইতে হইবে বিশ্বনেতাদের।