ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য একান্ত ইউরোপীয় একটি সেনাবাহিনী গড়িয়া তুলিবার প্রস্তাব করিয়াছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। এইদিকে, তাঁহার এই বক্তব্যকে ‘ভীষণ অপমানজনক’ হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উল্লেখ্য, এই ভাবনাটি ম্যাক্রন কয়েকমাস পূর্বে একবার পেশ করিলেও তেমন কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করে নাই। এইবার স্বভাবতই ট্রাম্পের কড়া প্রতিক্রিয়ার কারণে ভাবনাটি লইয়া সাড়া পড়িয়া গিয়াছে।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসিবার পর হইতে ইউরোপ-আমেরিকা মৈত্রীর ক্ষেত্রে কিছুটা হইলেও আলগা ভাব আসিয়াছে। বিশেষ করিয়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হইতে ইউরোপের পিছনে আমেরিকার বিপুল সামরিক ব্যয়ের প্রসঙ্গটি ট্রাম্প যখন-তখন স্মরণ করাইয়া দেওয়ার বিষয়টি ইউরোপীয়দের নিকট পছন্দ না হইবারই কথা। এইবার আবার রাশিয়ার সহিত ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত একটি পরমাণু অস্ত্র চুক্তি হইতে সরিয়া আসিবার সিদ্ধান্ত লইয়া বসিয়াছেন ট্রাম্প। এই চুক্তি মোতাবেক ভূমি হইতে নিক্ষেপণযোগ্য মধ্যপাল্লার মিসাইল তৈরির ক্ষেত্রে উভয় দেশ সম্মত হইয়াছিল। ট্রাম্প এই চুক্তি হইতে সরিয়া গেলে ইউরোপের সঙ্গতভাবেই আতঙ্কিত হইবার কারণ রহিয়াছে। কেননা আমেরিকা চুক্তি মান্য না করিলে, রাশিয়াও একই পথ ধরিবে। স্বভাবতই দোড়গোড়ায় অবস্থিত রাশিয়ার যেকোনো ধরনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ভৌগোলিক দূরত্বজনিত কারণে আমেরিকা নহে, প্রাথমিকভাবে ইউরোপকেই ভাবিত করিবে। ম্যাক্রন এই ভাবনার জায়গাটিই স্পষ্ট করিয়াছেন। তাঁহার মতে নূতন বাস্তবতায় ইউরোপের নিরাপত্তার কথা ইউরোপকেই ভাবিতে হইবে। এই ভাবনা অপরে অর্থাত্ আমেরিকা আজীবন ভাবিতে থাকিবে তাহা ফরাসি প্রেসিডেন্টের মনে হয় না। ম্যাক্রন ইতিমধ্যে আপত্কালীন মুহূর্তে ভূমিকা রাখিতে সক্ষম একটি ইউরোপীয় যৌথ বাহিনী গড়িবার প্রস্তাবও দিয়াছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল মৃদু শর্ত সাপেক্ষে এই ধারণার পক্ষে মত দিয়াছেন। ইউরোপের অপর বৃহত্ শক্তি ব্রিটেন আপত্কালীন বাহিনীর পক্ষে থাকিলেও, ইউরোপীয় সেনাবাহিনীর বিপক্ষে। অবশ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) হইতে বাহির হইবার প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা ব্রিটেনের অবস্থানকে ইউরোপিয়ান দেশগুলি খুব গুরুত্বের সহিত না দেখিবারই কথা।
এক্ষণে প্রশ্ন হইতেছে, ম্যাক্রনের বক্তব্যে ট্রাম্প কেন এত ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিলেন। কেবল প্রতিক্রিয়া নহে, স্নায়ুযুদ্ধের আমলে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকাইতে গঠিত জোট ন্যাটোর ব্যয়ভারের ক্ষেত্রেও আমেরিকার গুরুভারের কথা নূতন করিয়া মনে করাইয়া দিয়াছেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের অনেকেই ইউরোপকে এইভাবে আমেরিকা হইতে দূরে সরাইয়া দেওয়ার উদ্যোগে বিস্ময় মানিতেছেন। ইহার মধ্য দিয়া আমেরিকার জাতীয় স্বার্থই বা কিভাবে রক্ষিত হইতেছে— তাহাও ভাবিয়া পাইতেছেন না অনেকে। অবশ্য ম্যাক্রনের প্রস্তাবও যে অদূর ভবিষ্যতে বাস্তবায়িত হইবে তাহার আলামতও তেমন দেখা যাইতেছে না। কেননা ইউরোপের নিরাপত্তা ইউরোপের হস্তেই তুলিয়া লইবার জন্য যেই বিশাল অঙ্কের অর্থ দরকার তাহা বিবেচনার বাহিরে রাখিলেও সেইরকম রাজনৈতিক বাস্তবতা এই মুহূর্তে আছে বলিয়া মনে হয় না।