করোনা ভাইরাসের এই দুর্বিষহ সময়ে দেশের দুইটি পেশার মানুষ সবচাইতে বেশি সদর্থক ভূমিকা পালন করিতেছেন। তাহারা যথাক্রমে চিকিত্সক ও পুলিশ। চিকিত্সকদের বিষয়ে আমরা ইতিপূর্বে বলিয়াছি। এখন পুলিশ সদস্যদের করোনা আক্রান্ত হইবার ক্রমবর্ধমান সংখ্যার দিকে তাকাইয়া আশঙ্কা জাগিতেছে। কারণ, করোনার এই ভয়াল বৈরী সময়ে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করিতেছেন—তাহারা কতটা মানবিক, কতখানি দায়িত্ববান! ইহার জন্য হূদয়ের অন্তস্তল হইতে তাহাদের প্রশংসা করিতেই হয়, তাহাদের প্রতি শ্রদ্ধায় আপ্লুত হইতেই হয়। আসলে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের একটি বিপুল অংশ আমাদের গ্রামবাংলার খাটিয়া খাওয়া সাধারণ পরিবার হইতে উঠিয়া আসিয়াছে। বড়ো পদের সদস্যগণ কর্মকমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া নানা স্তরে বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়া থাকেন। এই উভয়ের সংমিশ্রণে যে একটি মানবিক বাহিনী গড়িয়া উঠিয়াছে—তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন দুর্যোগকালে।
এখন করোনা মোকাবিলায় দেশের পুলিশের কাজের তালিকা অনেক দীর্ঘ। সংক্রমণ ছড়ানো প্রতিহত করিতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, রাস্তায় জীবাণুনাশক ছিটানো, শ্রমজীবী মানুষকে সহায়তা করা, সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করা, চিকিত্সা না পাইয়া থানায় হাজির হওয়া মানুষের চিকিত্সার ব্যবস্থা করা, ঘরে থাকা মানুষের নিকট চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পৌঁছাইয়া দেওয়া, কোয়ারেন্টাইন হইতে পালাইয়া যাওয়া ব্যক্তিকে খুঁজিয়া বাহির করা, লকডাউন এলাকায় মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা প্রভৃতি। ইহা ছাড়া করোনায় মৃতদের দাফনের ব্যবস্থাতেও তাহাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করিতে দেখা যাইতেছে। এই সকল কাজে ঢাকাসহ সারা দেশে দুই লক্ষাধিক পুলিশ দিবারাত্রি দায়িত্ব পালন করিতেছেন। দেখা যাইতেছে, যেই সকল পুলিশ সদস্য রাস্তায় টহল ও তল্লাশি করিতেছেন, তাহাদের ভিতরে করোনা আক্রান্তের হার সবচাইতে বেশি। তাহারা রাস্তায় মানুষের সংস্পর্শে আসিতেছেন আবার একটি গাড়িতে পাশাপাশি বসিয়া ব্যারাকে ফিরিতেছেন। ইহাতে একজন কোনোভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হইলে সহজেই তাহা অন্যকে সংক্রমিত করিবার আশঙ্কা থাকিতেছে। ঢাকার রাজারবাগ আবাসনে এই কারণে করোনার সংক্রমণ বেশি হইয়াছে বলিয়া মনে করা হইতেছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী নয় শতাধিক পুলিশ করোনায় আক্রান্ত হইয়াছেন। ইহাদের মধ্যে কেবল ঢাকাতেই আক্রান্তের সংখ্যা অর্ধেকের কাছাকাছি। ইহার মধ্যে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন বেশ কয়েক জন।
পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যদি এইভাবে অসুস্থ হইয়া পড়েন এবং তাহাদের বৃহত্ একটি অংশ যদি কোয়ারেন্টাইনে চলিয়া যান, তাহা হইলে আসন্ন দিনগুলিতে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধির সহিত পাল্লা দিয়া পুলিশ বাহিনীর বৃহত্ অংশও নিষ্ক্রিয় হইয়া পড়িতে পারে। ইহার প্রতিক্রিয়া হইবে ভয়াবহ। করোনার দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া উহা মোকাবিলার উপযুক্ত নিজস্ব সুরক্ষার বলয়ে কোনো ঘাটতি রহিয়াছেন কি না তাহা আরো যাচাই করিয়া দেখিতে হইবে। করোনায় অধিক পরিমাণে আক্রান্ত হইয়া পুলিশ বাহিনীর মনোবল যাহাতে কোনো অবস্থাতেই চিড় না ধরে সেই দিকে সরকারের বিশেষ খেয়াল রাখিতে হইবে। এই বাহিনীর তত্পরতা কমিয়া গেলে আইনশৃঙ্খলাও ঝুঁকির মধ্যে পড়িবে।