কোভিড-১৯ :কোথাকার জল কোথায় গড়াল

নাদিরা মজুমদার

২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। সেদিন এক ঘোষণায় বলা হলো যে জাপানের ইয়োকোহামা বন্দরে নোঙর করা ‘ডায়মন্ড প্রিন্সেস’ নামক যুক্তরাষ্ট্রের প্রমোদতরির এক যাত্রী ‘কোভিড-১৯’ নামক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১০ জন সংক্রমিত হয়েছেন। সময়সূচি মোতাবেক দিনটি ছিল প্রমোদতরির প্রমোদযাত্রার শেষ দিন। দেশের অভ্যন্তরে রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত জাপানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘কালসুনোবো কাতো’ ১৪ দিন স্থায়ী ‘কোয়ারেন্টাইন’-এর ঘোষণা দিয়ে ‘প্রিন্সেস’কে ইয়োকোহামা বন্দরে আটকে রাখেন। জাহাজে যাত্রী ও ক্রু মিলিয়ে ছিল ৩ হাজার ৭১১ জন, যাত্রীদের বিরাট অংশের বয়স সত্তরের ঊর্ধ্বে, মৃতের সংখ্যা ২২।  

যুক্তরাজ্যে রেজিস্ট্রিকৃত ‘ডায়মন্ড প্রিন্সেস’-এর মালিক ইসরাইলি-আমেরিকান মিকি অ্যারিসন (আদি মালিক বাবা টেড অ্যারিসন)। মিকির ছোটো বোন শারি অ্যারিসন ইসরাইলের অন্যতম বিত্তবান ও ক্ষমতাশীল নারী ব্যবসায়ী। এ দুই অ্যারিসন (ভাইবোন) ‘প্রিন্সেসে’র ঘটনাটিকে চমকপ্রদ ‘পিআর’ অপারেশনে পরিণত করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনসহ আরো কয়েকটি দেশ ‘স্বগৃহে কোয়ারেন্টাইন হোক’ ঘোষণা করে বিমানপথে যার যার নাগরিককে তার তার দেশে ফিরিয়ে আনে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক প্রেসের কল্যাণে দ্রুত সংবাদ স্টোরিতে পরিণত হয়। তদুপরি, ‘স্প্যানিশ ফ্লু’র (১৯১৮-১৯১৯) নজির টেনে আনে এবং দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করে যে মহামারি আকারে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা কোভিড-১৯-এর রয়েছে। ফলে মনুষ্য প্রজাতির বিলুপ্তি ত্বরান্বিত করতে আর কতক্ষণ! বাস্তব তথ্য ও সত্যবিবর্জিত এই ঘোষণা ‘গসপেল’-এ পরিণত হয়।

সাংবাদিকতার জগতে ‘ইয়েলো জার্নালিজম’, ‘ট্যাবলয়েড জার্নালিজম’, ‘চেকবুক জার্নালিজম’ ইত্যাদি নামের সাংবাদিকতা প্রচলিত আছে (আধুনিক কালে বলা হয় ‘ফেইক নিউজ’)। এজাতীয় সাংবাদিকতার প্রবর্তক উইলিয়াম র্যানডল্ফ হার্স্ট (দ্য সানফ্রানসিস্কো ইগজামিনার) ও জোসেফ ক্যাম্পবেল পুলিত্জার (দ্য  নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ড) নিজেদের পত্রিকার বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য ভ্রান্ত বা মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মুখরোচক ভাষায় এমন সব অতিরঞ্জিত উত্তেজক প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করে যে অবশেষে ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্প্যানিশ উপনিবেশ কিউবার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। 

রোগব্যাধিকে রুখতে জনসমষ্টির সুস্থ অংশকে লকডাউনে রাখার নজির কিন্তু ইতিহাসে নেই। সুইডেনের মহামারি বিশারদ প্রফেসর ইয়োহান গেসেকে (Johan Giesecke) সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে বলেন, কোভিড-১৯ ভাইরাস ফ্লুর অনুরূপ। এটা লঘু মাপের ব্যাধিগুলোর একটি। তা সত্ত্বেও এর অভিনবত্ব বা বাহাদুরি হলো যে মানুষকে যথার্থভাবে ভীতসন্ত্রস্ত করতে পেরেছে। ... সঠিক নীতি হলো সমাজের বয়স্ক ও দুর্বলদের সুরক্ষিত রাখা। পরিণামে ‘বাই প্রোডাক্ট’স্বরূপ গোষ্ঠী ইমিউনিটি (হার্ড ইমিউনিটি) অর্জিত হওয়া। সে পথ অনুসৃত হয়নি। ফলে কোয়ারেন্টাইনের নীতি অনুযায়ী রোগে সংক্রমিত অঞ্চলগুলোকে ইতালি বিযুক্ত করে, কিন্তু সময়মতো করতে ব্যর্থ হয়। অতঃপর সমস্ত জনসমষ্টিকে একে অপরের থেকে বিযুক্তকরণের পন্থা হিসেবে যার যার বাড়িতে বন্দি থাকার তথা লকডাউনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যাতে দলবদ্ধ রোগীরা হাসপাতাল সয়লাব করে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে। এটি ছিল ইতালির প্রেসিডেন্ট জিয়োসেপ কন্টে ও ফরাসির প্রেসিডেন্ট ম্যাঁক্রর যৌথ সিদ্ধান্ত (২৭ ফেব্রুয়ারি ফ্রাঙ্কো-ইতালিয়ান নেপ্ল্স সামিট)। বিজ্ঞানভিত্তিক লক্ষণাদির তোয়াক্কা না করে যুক্তরাজ্য ও আরো কয়েকটি দেশ লকডাউনের নীতি গ্রহণ করে। ইতালি বা যুক্তরাজ্যের আতঙ্ক সৃষ্টি করা পরিস্থিতির জন্য ভাইরাসের সত্যিকার ভূমিকা কতটুকু, সেটি কিন্তু একেবারেই অজানা। কারণ মহামারির মৌসুমে মৃত মাত্রকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোভিড-১৯-এর কোটায় ফেলা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব কয়টি বার্তায় বলা হয়েছে যে জনগোষ্ঠীর ওপরে মহামারির অভিঘাত নিম্ন। দেশের সীমান্ত বন্ধ করা যুক্তিহীন, (স্বাস্থ্যকর্মী বাদে) সংক্রমিতের কাছ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব (তিন ফুট) বজায় রাখা, হাইজিনের মাত্রা বৃদ্ধি করা, যেমন : হাত ধোয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি, জানালা খুলে ঘরের ভেতরে হাওয়া খাওয়ানো, হাঁচি-কাশির সময় কাপড়, গামছা বা রুমাল দিয়ে মুখ ঢাকা ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে।

সংক্রমিত জনসমষ্টিকে কোয়ারেন্টাইনের নীতিতে পৃথককরণের পরিবর্তে ২৯ মার্চ যুক্তরাজ্যও লকডাউন ঘোষণা করে। ইউরোপের অনেক দেশই জাতীয় অর্থনীতির ধসে পড়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও কোভিড-১৯-কে তাত্ক্ষণিক ভিত্তিতে জব্দ করার পরিবর্তে অতিরিক্ত সময় ধরে রোগটিকে ছড়িয়ে পড়তে দেয়। লকডাউনের অবশ্যম্ভাবী প্রবল চাপে ইত্যবসরেই অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে এবং বৈশ্বিক মন্দা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে মার্চ মাসের শেষের দিকে (ইউরোপীয় কায়দার) লকডাউন হয়। অদ্যাবধি বহাল রয়েছে (প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত)। লকডাউনের ঝাপটার প্রথম চোটেই কাবু হয়েছে অবকাঠামোসহ ‘সাপ্লাই লাইন’। যেমন : বাস-ট্রাক চলে না বলে শহর থেকে অনেক দূরে, দূরাঞ্চলের ‘নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টারত জনসমষ্টির শাকসবজি সংগ্রহের জন্য ঠেলাগাড়ি, মাইক্রোবাস, ট্রাক আর আসে না, তাই ২০-২৫ টাকার জিনিস এক-দেড় টাকায় বিক্রি করার পরেও প্রচুর অবিক্রীত থাকে, পচে যায়, ফেলে দিতে হয়। দোয়ানো দুধ তুলে নেওয়ার জন্যও বাহন নাই বলে দুধ ঢেলে ফেলে দিতে হয়। এগুলো কি অপচয়ের উদাহরণ নয়? এসব পণ্য, পূর্বের মতো, সংগ্রহকরণ ও বিতরণ কি সম্ভব নয়? নিশ্চয়ই সম্ভব। যা সম্ভব তা করা হবে না কেন?

খাদ্যের সংস্থানের স্থায়ী ব্যবস্থায় আমাদের অনতিবিলম্বে ফিরে যেতেই হবে। বছরে তিনবার ফসল তোলার সামর্থ্য আমাদের আছে, আর আমাদের কি সৌভাগ্য যে বোরো ধান কাটার মুহূর্ত এখন। তবে  লকডাউনকৃত অন্য সব দেশের  জনসমষ্টির মতো বাংলাদেশের জনসমষ্টিও ‘কোভিড-১৯’ দ্বারা নয়, ‘আতঙ্ক-ভাইরাসে’ আতঙ্কিত। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে যারা ধান কাটতে জানেন তাদের মানসিক ও বৈষয়িক—সব ধরনের যথার্থ সাহায্য প্রদান করে ধান কাটার কাজে নিয়োগ না করে উপায় নেই।

লকডাউনের কারণে পৃথিবীর অনেক দেশে, যেমন : যুক্তরাজ্যের সুপারমার্কেটে ময়দা-ডিম পাওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রেও তথৈবচ। দিনের পর দিন দরকারি খাদ্যের সরবরাহ নেই এবং সরবরাহ নেই বলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফুড ব্যাংক’গুলোও অভাবিদের খাদ্য দিতে পারছে না। এরকম আরো উদাহরণ রয়েছে। অবশ্য আমরা তথা বিশ্ব কিন্তু বিপর্যয়ের প্রাথমিক পর্বে রয়েছি। 

ব্রিটিশরাজের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৪৩ সালে উড়িষ্যা ও বঙ্গদেশে যে মন্বন্তর ঘটিয়েছিলেন, ফলস্বরূপ তিন-সাড়ে তিন মিলিয়ন মানুষ সে ফ খাদ্যাভাবে মারা যায়। এবং আমার মতো যারা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দেখেছেন, তারা জানেন যে যুক্তরাষ্ট্র জাহাজভর্তি শস্য আমাদের দেয়নি, বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিয়েছিল। তাই লকডাউন নামক শনির দৃষ্টি এড়ানোর ব্যবস্থা আমাদের নিতে হবে বইকি।

সবশেষে, ইম্পেরিয়াল কলেজের খ্যাতনামা ‘প্রফেসর লকডাউন’ নিল ফার্গুসন লকডাউনের শনির দৃষ্টি কীভাবে এড়ানো যায় তার সমাধান দেননি, তবে (জার্মান) ইমেরিটাস প্রফেসর জুখারিট ভাগদি (Dr. Sucharit Bhakdi) ২৬ মার্চ চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেলকে একটি খোলা চিঠি লেখেন, সেটি কিন্তু পড়ার দাবি রাখে। গুগল-এ ‘ওপেন লেটার টু চ্যান্সেলর মারকেল’ লিখে গুগলিং করলেই ইংরেজি ভার্সন পাওয়া যাবে। প্লিজ পড়ুন!  

n লেখক : বিজ্ঞান লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

nadirahmajumdar@gmail.com