অনলাইনে সক্রিয় উগ্রবাদী গ্রুপ

করোনা পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মানুষ ‘গৃহবন্দি’। আর তরুণেরা এই বন্দিজীবনে সক্রিয় অনলাইনে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উগ্রবাদী নেতারা হতাশাগ্রস্ত তরুণদের দলে টানার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রুপের তত্পরতা ভেস্তেও দিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। আনসার আল ইসলামের এক শীর্ষ নেতা গ্রেফতারও হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই তত্পরতা যথেষ্ট নয় বলে দাবি করছেন। তারা বলছেন, অনলাইনের বিশাল প্ল্যাটফরম, এখানে নজরদারি আরো বাড়াতে হবে।

উগ্রবাদের বিস্তার নিয়ে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও। তিনি বলেছেন, করোনা ভাইরাস মহামারির সুযোগে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিতে পারে। সম্প্রতি এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, মহামারির কারণে কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো তরুণদের হতাশা ও ক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এর ফলে একটি প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সামাল দিতে পারবে না বিশ্ব।

গত ৩০ এপ্রিল রাজধানীর আরামবাগ এলাকা থকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের একটি দল আনসার আল ইসলামের শীর্ষস্থানীয় নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে সগির আহমেদকে (৩৯) গ্রেফতার করেছে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, সগির আনসার আল ইসলামের হয়ে তার সমমনা উগ্রপন্থি ব্যক্তিদের নিয়ে গ্রুপ তৈরি করে দেশব্যাপী উগ্রপন্থি জিহাদি কথা সংবলিত বয়ান প্রচার করছিলেন। একই সঙ্গে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে দলে টানার চেষ্টা করছিলেন। তিনি ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সংগঠনের উগ্রপন্থিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। তার বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় মামলা রয়েছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরাও উগ্রবাদী গ্রুপের বেশ কয়েকটি এমন উদ্যোগ ভেস্তে দিয়েছি। হতাশাগ্রস্ত তরুণদের দলে টানার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু দেশে এই মুহূর্তে জঙ্গিদের বড়ো ধরনের তত্পরতার কোনো সুযোগ নেই। তবে তরুণদের বিভ্রান্ত করে আবারও উগ্রবাদে জড়িয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কা তো আছেই। আমাদের বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে। এ ধরনের যে কোনো উদ্যোগ আমরা ভেস্তে দিতে প্রস্তুত রয়েছি।’

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই তত্পরতা যথেষ্ট নয় বলে দাবি করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ‘অনলাইন এক বিশাল প্ল্যাটফরম। এখানে নানাভাবে তত্পরতা চালিয়ে ওদের উদ্যোগ ভেস্তে দিতে হবে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে চেষ্টা, সেটা যথেষ্ট নয়। এই তত্পরতা আরো বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের বহু তরুণ বেকার। লকডাউনের সময় তারা হতাশাগ্রস্তও। এই তরুণদের দলে টানা খুবই সহজ। এই তরুণেরা অলস সময়ে অনেক বেশি অনলাইনে সক্রিয়। ফলে সবার কার্যক্রমে বিশেষ নজর রাখতে হবে, যাতে কেউ তাদের ভুল পথে নিতে না পারে।’

জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেসও বলেছেন, বর্তমান সময়ে বিশ্বের প্রতি পাঁচ জন তরুণের মধ্যে এক জন বেকার বসে আছেন। তাদের পড়াশোনা নেই, কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই, নেই কোনো চাকরি বা কাজ। এ ছাড়া প্রতি চার জন তরুণের মধ্যে এক জন সহিংসতা অথবা সংঘাতের শিকার। তরুণদের এই হতাশা ও ক্ষোভকে কাজে লাগানো সহজ হয়ে যায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য। ফলে উগ্রবাদের ঝুঁঁকি বেড়ে যায়।

গত মার্চেও এক নারীসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) পাঁচ সদস্যকে আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। তারাও অনলাইনে কার্যক্রমের কথা স্বীকার করেছিল। তবে এখানে যে জঙ্গিরা তত্পরতা চালাচ্ছে, তাদের সঙ্গে বিদেশি জঙ্গিদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখানকার স্থানীয় কিছু উগ্রবাদী নেতা এসব তত্পরতা চালাচ্ছে। তাদের আমরা নিয়মিত মনিটরিংয়ের মধ্যে রেখেছি।’