করোনা ভাইরাস

লকডাউন কাজ করছে না, ইমিউনিটি এখন বাংলাদেশের একমাত্র পথ :বিশেষজ্ঞ

বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাস রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৫৮ দিন আগে। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দশ হাজারের ওপর। দেশের শীর্ষ ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলছেন, বাংলাদেশে করোন ভাইরাস মহামারির প্যাটার্ন বা আক্রান্তের সংখ্যা নির্দেশকারী গ্রাফে এর ওঠা-নামার চিত্রটা দেখলে দেখা যাবে, ২০ এপ্রিল ৪৯২ জনের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। তারপর দৈনিক আক্রান্তের এই হার ওঠানামা করে এখন ছয়শোর  কোঠায় পৌঁছেছে। মাঝে এই সংখ্যা পাঁচশোর ঘরে ছিল। দিনে দিনে এই কার্ভটা (গ্রাফে আক্রান্তের রেখাচিত্র) উঠে যাচ্ছে। সমস্ত ইনফেকটেড লোকের ৫৫ শতাংশ ঢাকা শহরে। আর সব আক্রান্তের ৮৭ শতাংশ ঢাকা বিভাগে। তিনি মনে করেন, বিশেষ করে ঢাকায় সংক্রমণের বিষয়টা ঠিকমত নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ইনফেকশনটা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে, সেটা যে সহসা কমবে তার কোন লক্ষণ নেই।

তিনি বলেন, গত ২৮ এপ্রিল গার্মেন্টস খুলে দেওয়া হয়েছে এবং এর কী প্রভাব পড়বে তা ১২ মে থেকে আমরা পাওয়া শুরু করব। দোকানপাটও এতোদিন বন্ধ থাকার পর খুলে দেবার যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর প্রভাবে এই গ্রাফ আরো ঊর্ধ্বমুখী হবে বলে তিনি মনে করেন।

সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশের মানুষও গভীর উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছে কবে তারা এই শঙ্কা-মুক্ত হবে।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, এই সংক্রমণ যদি অব্যাহত থাকে তাহলে হার্ড ইমিউনিটি না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। হার্ড ইমিউনিটি- অর্থাত্ কিছু লোক মারা যাবে এবং অনেক মানুষ ইমিউন (প্রাকৃতিকভাবে ভাইরাস প্রতিরোধী) হয়ে যাবে। মানুষের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠলে তবেই এই ভাইরাস থেকে ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা চলে যাবে বলে তিনি মনে করছেন। তবে এখানে সতর্ক হবার কারণও রয়েছে বলে তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। এই ভাইরাস যদি এর মধ্যে মিউটেট করে (আচরণ পরিবর্তন করে), তাহলে কিন্তু তা নাও হতে পারে। কারণ মিউটেট করলে সেটা নতুন ভাইরাসে পরিণত হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্ট যেটা আমরা এখন করছি, সেটাও আবার তখন কাজে লাগবে কি না তাও জানা নেই।

ভ্যাকসিন প্রয়োগ করার মানে হলো- কৃত্রিম উপায়ে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। তবে কেউ যদি করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে থাকে তাহলে স্বাভাবিক নিয়মে তার শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠবে।

তার মতে, এই ভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটির ওপর ভরসা করেই থাকতে হবে। কারণ বাংলাদেশে উচ্চ মানের লকডাউন আরোপ করা সম্ভব না। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা তো করলাম এক মাস ধরে। পারছি না তো। সবাই চেষ্টা করেছে। পুলিশ চেষ্টা করেছে, আর্মি চেষ্টা করেছে, ভলান্টিয়াররা চেষ্টা করেছে। আমরা পারছি না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এই রোগ মোকাবেলার একমাত্র উপায় যে মানুষের মধ্যে ইমিউনিটি তৈরি হওয়া, সরকারকে সেটা মানতে হয়তো বাধ্য হতে হবে। অধ্যাপক ইসলাম বলেন, আমেরিকা বা ইতালিতে কর্তৃপক্ষ যেভাবে লকডাউন কার্যকর করতে পারে, বাংলাদেশ সেভাবে এই লকডাউন কার্যকর করতে পারছে না।

বাংলাদেশে মানুষজনের যে আচরণের ধরন আর বাংলাদেশ সরকারের যে সক্ষমতা, এই দুটো যদি আপনি চিন্তা করেন, তাহলে বাংলাদেশের সরকার এইরকম আচার-ব্যবহারওয়ালা জনগোষ্ঠিকে প্রকৃতভাবে লকডাউন করাতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।