থমকে গেছে ওদের সংসারের চাকা

এই দুর্দিনে ১০ লাখ রিকশাচালকের খোঁজ নেয়নি কেউ

পিনাকি দাসগুপ্ত

রাজধানীতে রিকশাশ্রমিকের (চালক) সংখ্যা কত, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে কমবেশি রিকশার সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। করোনা ভাইরাস সৃষ্ট পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গোটা দেশের মানুষের সঙ্গে সংকটে রিকশাচালকেরাও। বিত্তবান বা সামর্থ্যবানরা এ (লকডাউন) সময়ে ঘরে থাকতে পারলেও কেবল দুমুঠো খেয়ে-পরে বাঁচতে তীব্র ঝুঁকি নিয়েই রিকশাশ্রমিকদের অনেকেই নামছেন সড়কে। কিন্তু এত কিছুর পরেও যাত্রী না থাকায় জুটছে না সংসার খরচ। অচেনা-অপরিচিত সময়ের এ ধাক্কাটা বুঝি অনেকটা জোরেশোরেই লাগল খেটে খাওয়া এই শ্রমজীবী মানুষদের জীবনে। ক্ষুধা আর শঙ্কায় দিনাতিপাত করা মানুষগুলোকে গ্যারেজভিত্তিক পরিকল্পিত ত্রাণ সহায়তার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে প্যাডেলচালিত রিকশার চেয়ে ইঞ্জিনচালিত রিকশার চালকেরা কিছুটা স্বস্তিতে আছেন বলে জানা গেছে।

গতকাল বুধবার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার রিকশাচালক ওসমান আলী জানান, সকাল ৯টার দিকে রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন। গ্রীষ্মের তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে তিনি তেজগাঁও, সাতরাস্তা, হাতিরঝিল এলাকায় ঘুরেছেন। যাত্রী পেয়েছেন মাত্র তিন জন। সব মিলিয়ে ৭০ টাকা পেয়েছেন। পাঁচ সদস্যের সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলেও ছিল না খুব একটা টানাপোড়েন। কিন্তু মহামারি করোনা স্বাবলম্বী এ মানুষটিকেও করে তুলেছে অন্যের মুখাপেক্ষী।

রিকশাচালক আবুল হোসেন বলেন, ‘সকাল ১০টা থেকে দুপুরে সোয়া ১২টা পর্যন্ত তিনটা খ্যাপ মারছি। এক জন দিছে ১৫ টাকা, এক জন দিছে ২০ টাকা, আর এক জনে দিছে ৪০ টেকা। কেমনে চলমু। সংসারে আট জন খাওয়াইয়া।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেকে রিকশা নিয়া বাইর হইতে ভয় পায়। কারণ বাইর হইলে পুলিশ গদি নিয়ে যায়, গাড়ি উলটাইয়া দেয়, চাক্কার হাওয়া ছাইরা দেয়।’

কেউ কেউ বাইরে বের হলেও গ্যারেজে অলস পড়ে থাকা তিন চাকার বাহনগুলোর মতোই থমকে গেছে বেশির ভাগের ভাগ্য। জুটছে না তিন বেলার আহার। নেই বিকল্প উপার্জনের পথও। পেটের দায় মেটাতে গিয়ে মানুষগুলো যাতে পরনির্ভরশীল হয়ে না পড়ে—সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঘরবন্দি একলা থাকার এ সময়ে কর্মহীন-ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর দায় আমাদেরই।

এ দিকে লকডাউনের মধ্যে এখন রাজধানীর প্রধান সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইঞ্জিনচালিত রিকশা। এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের প্যাট্রল ইন্সপেক্টর (তেজগাঁও) তৈয়ব আলী বলেন, গণপরিবহন তো নেই। মানুষকে তো ঘর থেকে জরুরি কাজে বের হতে হয়। এ অবস্থায় ইঞ্জিনচালিত রিকশা তাদের ভরসা। তাই পুলিশ তাদের (ইঞ্জিনচালিত রিকশা) চলাফেরায় বাধা দিচ্ছে না।

কথা হয় ইঞ্জিনচালিত রিকশাচালক মঞ্জু মিয়ার সঙ্গে। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী। থাকেন নাখালপাড়ায়। তিনি বলেন, রিকশা (ইঞ্জিনচালিত) ভাড়া প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে ২৫০ টাকা। তবে আগে মহল্লার অলিগলিতে চালাতাম। এখন কখনো সদরঘাট, কখনো বিমানবন্দর, আব্দুল্লাহপুর, মিরপুরসহ অনেক এলাকাতেই যাত্রী নিয়ে যাচ্ছি। আয় কেমন হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি হেসে বলেন, আগের চেয়ে সামান্য কিছু বেশি।