পৃথিবীর মোট আয়তনের শতকরা ৭০ ভাগ জল এবং ৩০ ভাগ স্থল। পৃথিবীর বেশিরভাগ অংশজুড়ে পানি থাকলেও আমরা তার সবটুকু ব্যবহার করতে পারি না। কারণ মোট পানির ৯৭ ভাগ লোনা, যা ব্যবহারের অযোগ্য। বাকি ৩ ভাগ মিঠাপানি ব্যবহারের যোগ্য হলেও পুরোটা ব্যবহারযোগ্য নয়। কারণ ৯৭ ভাগ মিঠাপানিই হিমবাহ ও বরফ আকারে ওশেনিয়া, গ্রিনল্যান্ড, সাইবেরিয়া, হিমালয় পর্বত ইত্যাদি স্থানে জমাট অবস্থায় আছে। বাকি ৩ ভাগ পানি রয়েছে নদী-নালা, খাল-বিলে ও বৃষ্টিরূপে যেটাকে আমরা চাইলেই নানা কাজে ব্যবহার করতে পারি।
কৃষিকাজে পানির প্রয়োজন হয় সব থেকে বেশি। কিন্তু সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ুর পরিবর্তনসহ নানা কারণে মানব সভ্যতা আজ পানি সংকটের মুখোমুখি। যদিও লোনাপানিকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মিঠাপানিতে পরিণত করা সম্ভব, কিন্তু তা ব্যাপক মাত্রায় আমাদের প্রয়োজন মেটাতে পারবে না।
পৃথিবীর মোট পানিসমপদের মাত্র ০.৭% ব্যবহার উপযোগী। এই ০.৭% পানির আবার ৮৭% কৃষিকাজে ব্যবহূত হয়। বিশ্বে প্রতিনিয়ত মানুষ বাড়ছে। এই বেড়ে চলা মানুষের খাদ্যের জোগানের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে পানির ব্যবহার বেড়েই চলছে। বাংলাদেশের মোট সেচযোগ্য জমির ৭৭% ভূগর্ভস্থ ও ২৩% ভূউপরিস্থ পানি দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। ভূগর্ভস্থ পানির অধিক ব্যবহারের ফলে পানির স্তর ধীরে ধীরে নীচে নেমে যাচ্ছে। আবার বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বেশিরভাগ নদীর উজান অনিয়ন্ত্রিত ও অসম পানি উত্তোলনের ফলে আমাদের দেশ ভূউপরিস্থ পানি স্বল্পতায় ভুগছে। তাই কৃষিক্ষেত্রে সেচ সাশ্রয়ী ফসল চাষ এখন সময়ের দাবি।
আমাদের দেশে সাধারণত আউশ, আমন ও বোরো ধান চাষ করা হয়। বোরো মৌসুম পুরোটাই সেচনির্ভর। আউশ আর আমন বৃষ্টিনির্ভর। তাই আউশ-আমনের ফলন বাড়ানো দরকার। প্রতি কেজি বোরোধান উত্পাদনে মাটিভেদে ৩ থেকে ৫ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়।
উপকূলীয় এলাকায় যখন বন্যা হয় তখনিই ফসলের বেড প্রস্তুত করা যেতে পারে। এতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। আমাদের খাদ্যাভাসের পরিবর্তনও কৃষিতে পানি সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আলু একটি সেচ সাশ্রয়ী উচ্চ ফলনশীল ফসল। আমরা ভাতের পরিবর্তে আলুকে আমাদের প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। আলুতে প্রায় ভাতের সমান শর্করা ও নানা পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান।
আবার এক হেক্টর জমি থেকে যেখানে ধান পাওয়া যায় ৫-৬ টন, সেখানে ভুট্টা পাওয়া যায় ১০-১২ টন যা অধিক সেচ সাশ্রয়ী। পাশাপাশি অন্যান্য ফসল চাষের ক্ষেত্রে সাধারণ পদ্ধতি থেকে একটু ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করলেই আমরা সেচ থেকে অনেক পানি সাশ্রয় করতে পারি। সবজি, ডাল জাতীয় ফসল বেড পদ্ধতিতে চাষ করলে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩০% পানি সাশ্রয় হয়। ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে নালা পদ্ধতি থেকে ৩০-৪০% কম পানি লাগে। পানির ওপর ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ করলে সেক্ষেত্রে আলাদা করে সেচ দিতে হবে না। পাশাপাশি চাষের জমিও বেঁচে যাবে। বরেন্দ্র অঞ্চল, চরাঞ্চল যেসব এলাকায় বেলে মাটির আধিক্য বেশি সেখানে ধান চাষ না করে বাদাম, সবজি ইত্যাদি চাষ করা যেতে পারে।
ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, ভূ-উপরিস্থ পানির অপ্রাপ্যতা এবং লবণাক্ত পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের কৃষক কৃষিকাজে সেচ দিতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। আবার অতিরিক্ত সেচের ফলে ব্যবহার যোগ্য মিঠা পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে উল্লিখিত উপায়গুলো অনুসরণ করলে সুফল মিলবে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়