কর্মক্ষেত্রে প্রাণহানি রোধে সচেতনতার বিকল্প নাই

২০১৮ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হইয়া বিভিন্ন সেক্টরে ৮৯৮ জন শ্রমিক নিহত হইয়াছেন, আহতের সংখ্যা ৩৪১। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত দুইটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বার্ষিক জরিপ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলিয়া ধরা হইয়াছে। প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হইয়াছে যে অনিরাপদ কর্মক্ষেত্রের কারণেই এইসকল হতাহতের ঘটনা ঘটিয়াছে—যাহা বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। লক্ষণীয় যে এক বত্সর আগে, ২০১৭ সালে, এই ক্ষেত্রে নিহতের সংখ্যা ছিল ১২৪২ জন। অতএব, এই ভাবিয়া সান্ত্বনা পাওয়া যাইতে পারে যে গত এক বত্সরে পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হইয়াছে। হতাহতের সংখ্যা হ্রাস পাইয়াছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আত্মপক্ষ সমর্থনে ইহাও বলা যায় যে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে— যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ শিল্প ও নির্মাণ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত আছেন— সেখানে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত হতাহতের উক্ত হার মোটেও গুরুতর কিছু নহে। বিশেষত, ইহা সুবিদিত যে বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতেও সর্বপ্রকার সতর্কতামূলক ব্যবস্থাদি সত্ত্বেও এই ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। বস্তুত দুর্ঘটনার উপর কাহারও হাত নাই। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতায় আমরা দেখিয়াছি যে কর্মক্ষেত্রে প্রায়শ এমন অনেক মৃত্যুর ঘটনা ঘটিতেছে— যাহা সহজেই প্রতিরোধযোগ্য। ইহার জন্য প্রয়োজন কেবল সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিগত বত্সরগুলিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অগ্রগতি সত্ত্বেও এই একটি ক্ষেত্রে এখনো গুরুতর গলদ রহিয়া গিয়াছে।

গলদ কোথায়—সেই চিত্রটিও অস্পষ্ট নহে। আর তাহা বুঝিবার জন্য কেবল প্রাণহানির সেক্টরভিত্তিক যে-তথ্য জরিপে উঠিয়া আসিয়াছে তাহাতে নজর দিলেও চলে। প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ ২৮১ জন প্রাণ হারাইয়াছেন পরিবহন খাতে। ইহার পরেই রহিয়াছে নির্মাণ খাত। এই খাতে নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ১৬৩ জন। ইহার বিপরীতে পোশাক শিল্পে নিহতের সংখ্যা মাত্র ২৮। অথচ এই খাতেই বর্তমানে সবচাইতে বেশি শ্রমিক কর্মরত আছেন। পরিবহন ও নির্মাণ খাতে অধিক সংখ্যক শ্রমিকের প্রাণহানির সর্বজনগ্রাহ্য কারণটি হইল, অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতা। পরিবহন খাতে চলমান চরম বিশৃঙ্খলার প্রতিবাদে স্কুলশিক্ষার্থীদেরও মাঠে নামিতে হইয়াছে। সৃষ্টি হইয়াছে অভাবনীয় পরিস্থিতির। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও এই ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় নাই। সন্দেহ নাই যে এই বিশৃঙ্খলারই বলি হইতে হইয়াছে প্রায় তিনশত পরিবহন শ্রমিককে। অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়িয়া নির্মাণযজ্ঞ চলিলেও এখনো যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থাদি ছাড়াই নির্মাণশ্রমিকদের বহুতল ভবনে কাজ করিতে দেখা যায়। ফলে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হইয়া পড়ে। এই দুইটি খাতের পর শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়াছে কৃষি খাতে। ইহার মুখ্য একটি কারণ হইল বজ্রপাত। এই ক্ষেত্রেও যে সচেতনতার বিকল্প নাই তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে শ্রমিক, মালিক ও সরকার— সকল পক্ষকেই দায়িত্বশীল হইতে হইবে। লক্ষণীয় যে পোশাক শিল্পে উপর্যুপরি বেশকিছু বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর গৃহীত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাদির কারণে সেখানে পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হইয়াছে। অন্য সকল ক্ষেত্রেও এই দৃষ্টান্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করা উচিত বলিয়া আমরা মনে করি।