প্রকৃতির বন্ধু করোনা পর্ব-৩

করোনায় বেড়েছে পশু-পাখির অবাধ বিচরণ

২০১৯ এর ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে প্রাদুর্ভাব ঘটে করোনা ভাইরাসের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটিকে পরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোভিড-১৯ নামকরণ করে। ধারণা করা হয়, উহানের সামুদ্রিক খাবারের বাজার থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি। এখন পর্যন্ত ২১২টি দেশের প্রায় ৩৯ লাখ মানুষ করোনা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে । এই ভাইরাসে ২ লাখ ৬৬  হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। করোনায় একদিকে যেমন লকডাউনে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে মানুষ ঠিক তেমনি এর প্রভাবে পড়েছে পরিবেশের ওপরেও। পরিবেশের ওপর করোনার প্রভাব এবং ধারাবাহিক চার পর্বের  তৃতীয় পর্ব আজ।

চীন ও ইউরোপ লক ডাউন করার পর পরই আমেরিকা সহ বিশ্বের অনেক দেশ লকডাউনের ঘোষণা দেয়। থমকে যায় নগর জীবন সহ দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কার্যক্রম। একে একে বন্ধ হতে থাকে বিভিন্ন কল কারখানা। এতে স্বাভাবিক ভাবেই কমে আসে আকাশ পথ,নৌ পথ ও স্থল পথের যান চলাচল। পর্যটন এলাকা গুলো থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় মানুষের যাতায়াত কমে যায়। ঠিক এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই প্রকৃতি ফিরে যায় তার আগের রূপে। 

ইতালির ক্যাগলিয়ারিতে ডলফিন এবং মিলানের রাজহাঁসের একটি ছবি সম্প্রতি ইন্টারনেটে বেশ ভাইরাল হয়।  পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ভেনিস খালে তারা খেলায় মত্য ছিল। পরিবেশবিদরা বলছেন, সবকিছু যখন শান্ত থাকে তখন প্রাণীগুলি অন্যরকম আচরণ করবে এইটাই স্বাভাবিক। যানবাহন ও শব্দ দূষণ না থাকায় প্রকৃতি নিরাময় হওয়ার লক্ষণ ছিল এটি।

বাল্ড প্রজাতির ঈগল কয়েক দশক পরে প্রথমবারের মতো অ্যারিজোনায় ক্যাকটাসে বাসা বাঁধতে দেখা গেছে ।অ্যারিজোনা গেম এবং ফিশ বিভাগ (এজেডজিএফডি) ১৫ ই এপ্রিল তাদের ঈগল সমীক্ষা দল এই ছব টি টুইট করেছে। রাপ্টার পরিচালনার এজেন্সিটির সমন্বয়কারী কেনেথ "টুক" জ্যাকবসন বলেছেন, ১৯৩৭ সালে এরিজোনার সাগাওয়ারো ক্যাক্টিতে এই প্রজাতির ঈগলদের বাসা বাধতে দেখা যায়। বিংশ শতাব্দীতে তাদের জনগণ শিকারের দ্বারা হুমকির পরে, তাদের সাধারণত আর দেখা যায় নি। জ্যাকবসন এটিকে "আশ্চর্যজনক" আখ্যায়িত করে বলেন লকডাউনের কিছু দিনের পার্থক্যেই প্রকৃতি তার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, “আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি যে, আমরা যদি ইচ্ছা করি এই অবক্ষয়িত পৃথিবীকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব”।

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে গোল্ডেন গেট ব্রিজের উপর সতর্কীকরণ দাগ উপেক্ষা করেই কয়েক প্রজাতির হরিণকে ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের পাশে বিচরণ করতে দেখা যায়। ইতালির বার্সেলোনা এবং বার্গামোতেও বন্য শুকর সাহসী হয়ে উঠেছে তাদের কে প্রতিনিয়তই লোকালয়ে আসতে দেখা যায়। ওয়েলসের একটি নির্জন মাঠে ময়ূর, ল্যান্ডুডনে ছাগল এবং বন্য ভেড়ার অবাধ বিচরণ লক্ষ করে সাধারণ জনগন।

বার্ডসলাইফের সিনিয়র হেড অফ পলিসি এরিয়েল ব্রুনার বলেন “জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সংকটের অপরিবর্তনীয় প্রভাব ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হচ্ছে - প্রজাতিগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, বন্যা এবং খরা মানুষের জীবন ও আয়ের একটি বড় অংশ হুমকির মুখে পড়ছে।

জলবায়ু এবং পরিবেশবিদ স্কেপারস বলেন “বরতমান করোনার এই পরিস্থিতি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিচ্ছে। প্রয়োজন হলে এই জীবন ব্যবস্থা পরিবর্তন করে পরিবেশ বান্ধব জিবন-যাপন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রকৃতির ক্ষতি গুলি ক্রমান্বয়ে প্রক্রিয়াগুলি ইউরোপীয়দের কাছে দৃশ্যমান করে তুলতে হবে, এই ধীর গতিএর পরিবর্তন গুলি চিহ্নিত করা অনেক কঠিন হয়ে দাড়ায়। করোনা ভাইরাস যেমন করছিল ঠিক এতটা দ্রুত প্রভাবিত করে না। তবে করোনা এবং জলবায়ু দুজনেই দেখায় যে প্রকৃতির সাথে আমাদের সম্পর্ক বদলাতে হবে।”

জনশূন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ডলফিনের প্রথম দেখা মেলে গত ২৩ তিন দশক পর বাংলাদেশের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে দেখা মিলছে ডলফিনের।  

স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিন আগে কয়েকজন সার্ফার সমুদ্র সৈকতে সার্ফিং করতে গিয়ে ডলফিনের এই দলটি প্রথম দেখতে পান। এ সময় মাহাবুবুর রহমান নামের এক সার্ফার ডলফিনের দলটির খেলা করার দৃশ্য ভিডিও ধারণ করেন। যা ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, ‘‘অপরিকল্পিত পর্যটন ও অব্যাবস্থাপনার কারণে গত তিন দশকে সাগর সৈকতে মানুষের সমাগম বেড়েছে। এতে নীরবতা হারিয়েছে  সাগর। বেড়েছে দূষণ। পরিবেশবিদদের  মতে,  এ কারণে সাগরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ডলফিনের  জন্য সহায়ক ছিল না। তবে  এখন সৈকত খালি থাকায়  দূষণ কমে গেছে। অনুকূল  পরিবেশ পেয়ে  আবারও ফিরে আসছে ডলফিনরা।’’

ইত্তেফাক/এআর