মানবিক ও অমানবিক বাড়িওয়ালার গল্প

করোনা সংকটের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় ভাড়াটিয়ার বিদ্যুত্, পানি, গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। করোনা রোগীদের নিয়ে কাজ করার কারণে ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না এমন ঘটনাও কম নয়। দুর্যোগের রাতে ভাড়াটিয়াকে বের করে দিয়ে গ্রেফতারও হয়েছেন বাড়িওয়ালা। তবে এই মহাদুর্যোগে অনেক বাড়িওয়ালা এগিয়ে এসেছেন মানবিকতা দেখিয়ে। তারা শুধু ভাড়াই মাফ করেননি, খাদ্য সংকটে থাকা ভাড়াটিয়াদের চাল-ডাল কিনেও পৌঁছে দিচ্ছেন। নিয়মিত খোঁজখবরও রাখছেন। অমানবিক বাড়িওয়ালাদের মানবিক হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন মানবিক বাড়িওয়ালারা।

জাতীয় ক্রিকেট দলের পেসার তাসকিন আহমেদের বাবা আবদুর রশিদ ১১ জন ভাড়াটিয়াকে এক মাসের বাড়িভাড়া মওকুফ করে দিয়েছেন। তাসকিনের ইচ্ছাতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছেন আবদুর রশিদ। নিজের জন্মদিনে ছেলে কী উপহার চায় জানতে চাইলে তাসকিন বাবাকে অনুরোধ করেন, ভাড়াটিয়াদের এক মাসের বাড়িভাড়া মওকুফ করে দিতে। এটাই হবে তার জন্মদিনের উপহার। মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডে তাদের বাড়ি। তাসকিনের বাবা আবদুর রশিদ বলেন, ‘তাসকিন              এসে আবদার করল, বাবা, তোমার ভাড়াটিয়াদের জন্য এক মাসের ভাড়া মওকুফ করে দাও। ছেলের কথায় আমিও খুশি হলাম। ও তো আর খারাপ কিছু আবদার করেনি। আবদার না রেখে কি আর পারা যায়? এরপর সে নিজ থেকেই বলল, ধরে নাও এটাই আমার জন্মদিনের উপহার।’

সায়েদাবাদে তিনটি বাড়ির মালিক শওকত আলী। ৩৫টি পরিবার সেখানে ভাড়া থাকেন। আপাতত দুই মাসের ভাড়া মওকুফ করেছেন তিনি। তবে করোনা আরো বেশি দিন থাকলে ভবিষ্যতেরও ভাড়া মওকুফের বিষয়টা বিবেচনা করবেন। প্রতি মাসে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা ভাড়া পেতেন। ৭ থেকে ১৪ হাজার টাকা প্রতিটি ফ্লাটের ভাড়া। ভাড়াটের মধ্যে যাদের খাবারের সংকট তাদের খাদ্য সহায়তাও দিচ্ছেন তিনি। শওকত আলী এই দুর্যোগে অন্য বাড়িমালিকদের মানবিক হওয়ার অনুরোধও জানিয়েছেন।

হাজারীবাগের বেড়িবাঁধে একটি ভবনের মালিক শেখ শিউলি হাবিব। তিনিও মার্চ ও এপ্রিল মাসের ভাড়া মওকুফ করে দিয়েছেন ভাড়াটিয়াদের। শুধু ভাড়া মওকুফ নয়, বিদ্যুত্ বিল, গ্যাল বিল ও পানির বিলও তিনি পরিশোধ করে দিয়েছেন। কেউ বিপদে পড়লে তাকে জানাতেও বলেছেন এই বাড়িমালিক। তবে তিনি ভাড়াটিয়াদের বলেছেন, ভাড়া মওকুফের পর যদি কারো সামর্থ্য থাকে তাহলে যেন দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ায়।

কামরাঙ্গীর চরের ছাতি মসজিদ এলাকায় দুটি ভবন। একটি পাঁচতলা আরেকটি চারতলা। দুই বাড়ির মালিক মোয়াজ্জেম হোসেন অপু। এই দুটি বাড়ি থেকে মাসে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকার মতো ভাড়া পান তিনি। আর চকবাজারের ইসলামগঞ্জের একটি বাড়ি থেকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ভাড়া পান। মিরপুর-১১ এর মদিনা নগরের একতলা বাড়ি থেকে ৪৫ হাজার টাকা ভাড়া পান। অপু বলেন, ‘আমার চারটি বাড়ি থেকে মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকার মতো ভাড়া উঠে। আমি আপাতত দুই মাসের ভাড়া মওকুফ করেছি।’ এই সংকটকালে অন্য বাড়িওয়ালাদেরও তার মতো এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

শুধু ঢাকা নয়, অন্য শহরেও এমন মানবিক বাড়িওয়ালা আছেন। চট্টগ্রাম শহরের উত্তর আগ্রাবাদের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে বহুতল মমতাজ ভবন। এ ভবনে বসবাস করেন ১২টি ভাড়াটিয়া পরিবার। বছরের অন্য সময় মাস শেষ হলেই ভাড়ার টাকা পৌঁছে দিতেন বাড়ির মালিকের কাছে। মমতাজ ভবনের মালিক মীর মোহাম্মদ রবি ১২ পরিবারের মার্চ মাসের ভাড়ার টাকা মওকুফ করে দেন। এই কঠিন দুঃসময়ে স্বস্তি পান ১২টি ভাড়াটিয়া পরিবার।

এমন অনেক মানবিক বাড়িওয়ালা আছেন। আবার উলটোদিকে অমানবিক বাড়িওয়ালাও আছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার আদাবর ৬ নম্বর আলিফা হাউজিংয়ের বাসিন্দা মো. শাহেদ জানালেন, তাদের বাড়ি মালিক আবুল হোসেন খলিফা ভাড়ার জন্য তাদের ওপর চাপ দিচ্ছেন। পাশের ভবনে বিদ্যুত্ পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। ৪০টি পরিবার চরম সংকটে আছে। আশপাশের অনেক মালিক ভাড়া মাফ করলেও তাদের মালিক করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। দ্রুত ভাড়া দিতেও চাপ দিচ্ছেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নাজমুল ইসলাম নামে এক রোগীকে বাড়ি থেকে মারধর করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাড়ির মালিকসহ এলাকার কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে। গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার রূপসী বাগবাড়ি এলাকায় এই নির্মম ঘটনা ঘটে। নাজমুল ময়মনসিংহের আবু সিদ্দিকের ছেলে। রূপসী বাগবাড়ি এলাকার নূর হোসেনের বাড়িতে তিনি ভাড়া থেকে স্থানীয় সিটি গ্রুপে চাকরি করার পাশাপাশি পড়াশোনা করেন। বুধবার রিপোর্টে তার করোনা পজিটিভ আসে। চিকিত্সকের পরামর্শে সে বাসাতেই ছিল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বাড়ির মালিকসহ এলাকার কিছু লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে ভয় দেখিয়ে জোর করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে  দেয়। যদিও রূপগঞ্জ থানার ওসি মাহমুদুল হাসান জানান, বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে ভাড়াটিয়াকে বাসায় উঠতে না দেওয়ায় রাজধানীর কলাবাগান থানার কাঁঠালবাগান এলাকার বাড়িওয়ালা নূর আক্তার শম্পাকে (৪৫) গ্রেফতার করে র্যাব। এক মাসের ভাড়া বাকি থাকায় দুই মাসের শিশুসহ তিন সন্তান ও তার বাবা-মাকে মারধর করে ঝড়ের রাতে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেন বাড়িওয়ালা শম্পা।