অভুক্ত পশু-পাখি :চাই সংবেদনশীল মন

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য লিখিয়াছেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। এই ক্ষুধার যন্ত্রণা শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নহে, পশু-পাখির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। দেশে করোনার দুর্যোগ যখন দেখা দেয়, তখন বাংলাদেশে একটি বিস্ময়কর ও অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। গত এপ্রিল মাসের শুরুতে রাজশাহীর চিড়িয়াখানার পাঁচটি হরিণশাবক ক্ষুধার্ত কুকুরের হানায় সাবাড় হইয়া যায়। এই করোনা মহামারির সময় আমাদের চারিপাশে বিচরণকারী প্রাণিকুলের খাদ্যব্যবস্থাও যে ভাঙিয়া পড়িতে শুরু করিয়াছে, ইহা ছিল তাহার প্রাথমিক ও জ্বলন্ত প্রমাণ। তবে আশার কথা হইল, নিজের শত অভাব-অনটন ও দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও অনেক মহানুভব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন এই দুর্যোগকালেও পশু-পাখির খাবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করিয়া চলিয়াছেন। এমনই একজন ব্যক্তি হইলেন পাবনার মিষ্টি ব্যবসায়ী সমর ঘোষ। করোনা পরিস্থিতিতে গত ২৬ মার্চ হইতে তাহার হোটেল-রেস্তোরাঁটি বন্ধ হইয়া গেলেও তিনি আগের নিয়ম অনুযায়ী ২ হাজারের মতো শালিক পাখির খাবারের জোগান দিয়া যাইতেছেন। প্রায় এক দশক ধরিয়া তিনি পাখিগুলিকে সন্তানের মতো আগলাইয়া রাখিয়াছেন। এই কঠিন সময়েও তিনি তাহাদের বিমুখ করিতেছেন না।

শালিক পাখিগুলি প্রতিদিন খায় প্রায় ১৫ হইতে ২০ কেজি চানাচুর। পাখিগুলির প্রতি অপরিসীম মায়া ও ভালোবাসা ছাড়া ইহা সম্ভব ছিল না। এই করোনার সময় বানর পিটাইয়া হত্যার মতো নির্মম খবর পাই আমরা। পাই ডলফিন হত্যার খবরও। আবার ইহারই বিপরীতে মাজারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা শত শত অভুক্ত বানরকে খাবার দিতে দেখা যায় অনেককে। অনেকে বাড়ি বা মহল্লার আশেপাশে ঘুরিয়া বেড়ানো কুকুর-বিড়ালকে রান্না করিয়া খাবার খাওয়াইতেছেন পরম আদর ও যত্নে। শহরের হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় রাস্তাঘাট ও ডাস্টবিনে খাবারের উচ্ছিষ্ট হ্রাস পাইয়াছে। তাই বেওয়ারিশ পশু-পাখিরা পড়িয়াছে খাদ্যের চরম সংকটে। ক্ষুধা মানুষ-পশু সবাইকে কাতর ও ক্ষুব্ধ করিয়া থাকে। আবাসস্থলের কাছাকাছি থাকা শিয়ালের সংঘবদ্ধ দল কর্তৃক গোয়ালঘর, মুরগির খামার এমনকি মানবশিশু আক্রান্ত হইবার খবরও এই জন্য ঘটিয়া থাকে। হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী লোকালয়ে ঢুকিয়া পড়ে খাদ্যের সন্ধানেই। শুধু তাহাই নহে, আমাদের চারিপাশে আরো অনেক প্রকার পশু-পাখি রহিয়াছে, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্যই তাহাদের খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেমন কাক, ময়না, বক, মাছরাঙা, হনুমান, বেজি, গুইসাপসহ এই রকম অনেক পশু, পাখি ও সরীসৃপজাতীয় প্রাণী। তাহাদের খাবারের প্রাকৃতিক উত্স নির্বিচারে উজাড় বা ধ্বংস করা বাঞ্ছনীয় নহে।

বন বিভাগের সহায়তায় একসময় ঢাকা সিটি করপোরেশনের পুরান ঢাকার বানরদের খাদ্য সরবরাহের প্রকল্প ছিল। একইভাবে যশোরে হনুমানদের সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে খাবার দেওয়া হইত। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই ধরনের নূতন উদ্যোগ কি নেওয়া যায় না? অনেকে ব্যক্তি উদ্যোগে পাখিদের মুড়ি-বিস্কুট খাওয়ান। প্রাণিকুলকে অভুক্ত দশা হইতে রক্ষায় এই সকল উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। একটি সভ্য সমাজে খাদ্যনিরাপত্তার কথা যখন চিন্তা করা হয়, তখন পশু-পাখিদের কথাও ভাবিতে হইবে। শুধু অ্যানিমেল রাইট বলিয়া কথা নহে, মানুষের নিরাপদ জীবন ও রোগ সংক্রমণ হইতে রক্ষার জন্যও তাহা একান্ত প্রয়োজন। কারণ ইবোলা, ম্যাডকাউ, রেবিস, সালমনেলাসহ অনেক মারাত্মক রোগের সম্পর্ক রহিয়াছে পশুপাখির অসুস্থতা ও বিপন্ন দশার সহিত। অতএব, যেসব পশুপাখি অন্তত আমাদের উচ্ছিষ্ট খাইয়া জীবন ধারণ করে, সেই সব উচ্ছিষ্ট ময়লা-আবর্জনার সঙ্গে না মিশাইয়া আলাদাভাবে রাখিয়া আমরা তাহাদের খাওয়াইতে পারি। যেমন মাছের কাঁটা, মাংসের হাড়, বাসি ভাত-তরকারি, রুটি ইত্যাদি। একটু সচেতন ও সংবেদনশীল হইলেই ইহা সম্ভব।