অধ্যাপক আ ব ম ফারুক
অত্যন্ত সংক্রামক করোনা ভাইরাসটি নতুন একটি ভাইরাস হওয়াতে এর বৈশিষ্ট্যগুলো বিষয়ে অনেক কিছুই অজানা। ফলে চিকিত্সার জন্য ওষুধ কিংবা প্রতিষেধক টিকা তৈরি করা ওষুধবিজ্ঞানীদের জন্য মহাসমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদেরকে তাই সাবধান থাকতে হবে, সতর্কভাবে চলাফেরা করতে হবে, যাতে আমাদের কোনো গাফিলতির কারণে আমরা করোনায় আক্রান্ত না হই।
কয়েক দিন আগেও ধারণা করা হয়েছিল যে, করোনা ভাইরাস কেবল স্পর্শ ও নাক-মুখ-চোখের মাধ্যমে ছড়ায়। বাতাসে ভেসে এটি মাত্র কয়েক ফুটের বেশি যেতে পারে না। তখনকার গবেষণা অনুযায়ী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও আমাদেরকে এমনটাই জানিয়েছিল। যে কারণে সভায়-রাস্তায়-বাজারে ভাইরাসটির সংক্রমণ ঠেকাতে এক জন থেকে আরেক জনের তিন ফুট এবং পরবর্তী সময়ে ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন জানা গেছে তা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) সম্প্রতি জানিয়েছে যে, করোনাক্রান্ত কেউ হাঁচি বা কাশি দিলে যে অসংখ্য জলকণা নাক বা মুখ দিয়ে বেরোয় তার মধ্যে যেগুলো একটু ভারী তা বেশি দূর যেতে পারে না, কয়েক ফুটের মধ্যেই মাটিতে পড়ে যায়। কিন্তু অধিকাংশ জলকণা এতই সূক্ষ্ম যে সেগুলো ছোটো ছোটো মেঘের সৃষ্টি করে বাতাসে ভেসে বেড়ায়। কিন্তু স্বচ্ছ বলে এই করোনার মেঘ আমরা দেখতে পাই না, তা অদৃশ্য থাকে। এর প্রতিটি জলকণায় অসংখ্য করোনা ভাইরাস থাকে। এগুলো বাতাসে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং বাতাসে ভেসে নাকি ২৭ ফুট দূর পর্যন্ত যেতে পারে।
এটা যে কত মারাত্মক দুঃসংবাদ তা নিশ্চয়ই আমরা বুঝতে পারছি। অতএব আমাদের শুধু স্পর্শ বাঁচিয়ে চললেই হবে না। সরকার ও বিশেষজ্ঞদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও যারা ঘরে থাকছেন না, যারা ‘আমার কিছু হবে না’—এরকম মনোভাব নিয়ে এখনো বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন তারা যে কত বড়ো ঝুঁকি নিচ্ছেন চিন্তা করে দেখুন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বিজ্ঞানীরা হাটবাজার বা জনাকীর্ণ স্থানে মানুষের সঙ্গে স্পর্শ, সামাজিক দূরত্ব মেনে না-চলা এবং হাঁচি-কাশির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলকণার মাধ্যমে প্রচুর করোনা ভাইরাস সুস্থ মানুষের মধ্যে ছড়াচ্ছে বলে অনুমান করছেন। তাদের এই গবেষণা বিশ্বখ্যাত নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। হাঁচি-কাশির এই সব জলকণা, বিজ্ঞানীরা যেগুলোকে বলছেন ‘রেসপিরেটরি ড্রপলেটস’, এগুলোর মধ্যে যেগুলো তুলনামূলক বড়ো ও ভারী সেগুলো মুখ থেকে বেরিয়ে বেশি দূর যেতে পারে না। বড়োজোর কয়েক ফুট। তাই এক জন থেকে আরেক জনের ছয় ফুট দূরত্বে থাকার নিয়ম আমাদের নিরাপত্তার জন্যই অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু যদি করোনা-আক্রান্ত কেউ হাঁচি বা কাশি দেয়, তাহলে গবেষণার নতুন রিপোর্ট অনুযায়ী ২৭ ফুটের বেশি দূরত্বে থাকাটাই নিরাপদ। কিন্তু তা কি সম্ভব? তাই ঘরেই আমাদেরকে থাকতে হবে।
এমআইটির মতো জাপানের অতি সাম্প্রতিক গবেষণাতেও একই ফলাফলের প্রতিধ্বনি পাওয়া গেছে। তারা বলছে হাঁচি-কাশির অতি সূক্ষ্ম মাইক্রোনাইজড জলকণা, অনেকটা অ্যারোসলের মতোই; যার আকার অতি সূক্ষ্ম বলেই মাটিতে পড়ে না-গিয়ে ছোটোখাটো মেঘের আকারে সহজেই বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। এবং অদৃশ্য এই করোনামেঘ ২৭ ফুট পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে। আপনি অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে গেলে ছয় ফুট দূরত্ব রক্ষা করলেও, খোদা না করুন, যদি দৈবাত্ আপনার অজান্তেই এরকম একটা করোনামেঘের সংস্পর্শে আসেন তাহলে কী হতে পারে ভাবুন। কিন্তু খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আমরা যদি ঘরের বাইরে যাই, তাহলে রাস্তায় বা বাজারে বা জনাকীর্ণ স্থানে আমরা কি পারব সব সময় ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মধ্যে ছয় ফুট দূরত্ব রক্ষা করতে?
যখন ছয় ফুট দূরত্বকে নিরাপদ ভাবা হতো তখনই সরকারের পক্ষ থেকে ঘরে থাকার সব ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কারণ তখন ঘর থেকে বের হওয়া মারাত্মক বিপদের কারণ ছিল। আর এখন ২৭ ফুটের তথ্য আসার পর এই মারাত্মক বিপদ আরো অনেক গুণে বেড়ে গেছে। তাই ঘরেই থাকুন। চিকিত্সার কার্যকর ওষুধ ও প্রতিষেধক টিকার আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত করোনার ভয়ে আপনাকে ঘরে থাকতেই হবে। অন্য কোনো পথ নেই।
অনেকে পথ চলতে রাস্তায় সমানে থুতু ফেলেন। থুতু ফেলার জিনিস নয়। কারণ থুতুতে আছে টায়ালিন নামের অতি উপকারী এক এনজাইম, যা খাবার হজমে খুবই সাহায্য করে। শরীর এটা তৈরি করে একটা জটিল পদ্ধতির মাধ্যমে। মানুষ এখনো এটি শরীরের বাইরে তৈরি বা সিনথেসিস করতে পারেনি। অথচ এত মূল্যবান একটা জিনিস আমরা অসচেতনতার কারণে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তা ফেলে দিচ্ছি। অথচ বিজ্ঞানসম্মত নিয়ম হচ্ছে নেহাত কোনো কিছু ঘেন্নার না হলে থুতু না ফেলা। মুখে থুতু অনেকটা জমার আগেই গিলে ফেলতে হয়। থুতু গিলে ফেলা ঘেন্নার কিছু নয়, লজ্জার তো নয়ই। থুতুর আরেক নাম লালা। এটা পাচক রসের মতোই শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বলেই শরীর আমাকে সাহায্যের জন্য এটা আমার জন্যই তৈরি করছে—এরকম ভাবলে আশা করি থুতু গিলে ফেলতে অসুবিধা হবে না। বরং কালক্রমে থুতু না-ফেলাই অভ্যাসে পরিণত হবে।
এখনকার করোনাকালে রাস্তায় থুতু ফেলা বিপজ্জনক। করোনা রোগীর মুখনিঃসৃত থুতু-কফে লক্ষ লক্ষ করোনা ভাইরাস থাকে, যা করোনার প্রাদুর্ভাব ছড়াতে সাহায্য করে। যেখানে-সেখানে থুতু-কফ না ফেলা তাই এখন সামাজিক দায়িত্ব। আবার নিজের জন্যও যখন-তখন থুতু না ফেলা লাভজনক। কারণ এতে গলা শুকিয়ে যায় না, বরং ভিজে থাকে। বিজ্ঞান বলছে করোনার এই প্রাদুর্ভাবের সময় গলা সব সময় ভেজা অবস্থায় রাখা ভালো। কারণ গলা শুকিয়ে গেলে করোনা ভাইরাস গলার শুকিয়ে যাওয়া মিউকোসা দিয়ে সহজেই শ্বসনতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারার আশঙ্কা থাকে। তাই আসুন, করোনা রোগী বা সুস্থ নির্বিশেষে সবাই যেখানে-সেখানে থুতু ফেলা থেকে বিরত থাকি। ঘরে থাকার তাহলে আরো একটা সুবিধা পাওয়া গেলে, রাস্তার থুতু-কফের করোনা থেকে দূরে থাকা যাবে।
ঘরে থাকার আরো একটা সুবিধা হলো এখানে ঘনঘন হাত ধোয়া সহজ, যা করোনা প্রতিরোধের একটা বড়ো শর্ত। তাছাড়া চোখ-নাক-গাল কপাল প্রায়ই চুলবুল করে এবং আমাদের অজান্তেই চুলকানোর জন্য সেখানে হাত চলে যায়। ঘরের বাইরে থাকলে এটা আরো বেড়ে যায়। কিন্তু শরীরে করোনার প্রবেশ ঠেকাতে হাত না ধুয়ে চোখে নাকে মুখে হাত দেওয়া যাবে না। একই কারণে এখন বিজ্ঞানীরা সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পর দিনে কয়েক বার মুখ ধোয়ারও প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। ঘরে না থাকলে এগুলো করা খুবই অসুবিধা।
আরো একটা বিষয় এখানে উল্লেখ্য। করোনার ভাইরাস শুধু হাঁচি-কাশির মাধ্যমেই ছড়ায়, তা নয়। কথা বলা, হাসি, গান করা ইত্যাদির মাধ্যমেও ছড়ায়। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা তাই আরো জরুরি। মুখের লালার মাধ্যমেও ছড়ায় বলে থুতু ফেলা বারণ, তা আগেই বলেছি। কিন্তু যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই রাস্তায় চলে যাচ্ছেন মুক্ত অবস্থায় চা-পানি খাবেন বলে, তারা কি নিশ্চিত যে আপনার চায়ের কাপ বা পানির গ্লাসটি করোনামুক্ত? কিংবা যাদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন তারাও করোনায় আক্রান্ত নন? অনেককে দেখে তো মনেই হবে না যে তারা করোনায় আক্রান্ত, তাদের কোনো লক্ষণ নেই। তার চেয়ে ঘরেই থাকুন। ঘরই নিরাপদ।
ঘরে না থাকলে করোনা একের পর এক মানুষকে সংক্রমিত করতে থাকবে। সেখান থেকে আরো মানুষ, আরো মানুষ, এভাবে অনেক মানুষ আক্রান্ত হতেই থাকবে। সরকার দেশের মানুষকে বাঁচাতে যতই লক ডাউনের সময় বর্ধিত করুক, কোনো লাভ হবে না। আমরা ঘরে থাকতে শুরু করলে তবেই-না করোনাকে আমরা দমাতে পারব, লকডাউনের আর প্রয়োজন হবে না। কিন্তু আমরা যদি ঘরে না থাকি, তাহলে লকডাউনের প্রয়োজন কখনো শেষ হবে না।
n লেখক :পরিচালক, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়