করোনায় সম্মুখযোদ্ধাদের সাহসী পদক্ষেপ

জান্নাতুন নিসা

দেশ জুড়ে লকডাউন কিংবা সামাজিক দূরত্বের দীর্ঘ বন্দনায় আমরা সবাই যখন ঘরমুখী, তখন ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীগণ কোভিড-১৯ পজিটিভ শত রোগীর চিকিত্সাসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ঘর-সংসার, মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান সবাইকে দূরে ঠেলে কোভিডযুদ্ধের সশস্ত্র যোদ্ধা হিসেবে লড়াই করে চলেছেন দিনে কিংবা রাতে। রণাঙ্গনে যেভাবে একজন আহত সহযোদ্ধাকে কাঁধে তুলে নিয়ে দৌড়িয়ে শুশ্রূষা করা হয়। ঠিক সেভাবেই চলছে পরিচর্যা। তবে এই যুদ্ধ কোনো আণবিক বোমার কিংবা গুলিবর্ষণের নয়! এই যুদ্ধ প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনার বিরুদ্ধে, যার একমাত্র অস্ত্র একসঙ্গে দূরে থাকা। কিন্তু ডাক্তারকে করোনায় আক্রান্ত রোগীর কাছে থেকেই দিনের পর দিন তাকে সেবা দিতে হচ্ছে। জীবন বাজি রেখেই এই করোনাযুদ্ধে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করছেন তারা। অনেকে ইতিমধ্যে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। শতাধিক ডাক্তার, অর্ধশতকের বেশি নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বিশ্ব জুড়েই চিকিত্সকদের জন্য মিলছে না পর্যাপ্ত সুরক্ষা পোশাক। অপ্রতুল ওষুধ ও চিকিত্সা সরঞ্জাম। এত প্রতিকূলতা নিয়ে করোনাযুদ্ধে থাকা চিকিত্সকগণ থমকে যাননি, বরং দিন-রাত হাসপাতালে থেকে ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন করোনায় আক্রান্ত রোগীকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলতে। করোনার বিরুদ্ধে সম্মুখসমরের নায়ক একেকজন ডাক্তার কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী। আমরা যখন করোনায় আক্রান্ত রোগীকে আইসোলেশনে হস্তান্তর করে নিশ্চিন্ত, তখন একজন দায়িত্ববান ডাক্তার ব্যস্ত থাকছেন রোগীটির শুশ্রূষায়। সেবাই তাদের পেশার মূলমন্ত্র—সেই মন্ত্র উপচে আজ তারা যোদ্ধা। এর মাঝে অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তারা চিকিত্সা দিচ্ছেন না, কোথাও আবার হাসপাতাল বন্ধ। সেক্ষেত্রে বলতে হয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনার বাঁধন খুলে অধিকাংশ স্বাস্থ্যকর্মী হয়ে উঠেছে সবুজ বাংলার অদম্য যোদ্ধা। অথচ এই মানুষগুলো তো সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন, তবু তাদের মনোবল আজ তাদের যোদ্ধায় পরিণত করেছে। সেবার ব্রতে দীক্ষিত হয়ে জীবন বাজি রেখে করোনা ভাইরাসকে দূরে ঠেলে সবার মুখে হাসি ফোটাতে বদ্ধপরিকর হয়ে এগিয়ে এসেছেন।

স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। যাদের বাহিনী সৃষ্টির ইতিহাসই বোধ করি নেতিবাচক। তাই আমরা সব সময়ই বাঁকা চোখেই দেখেছি তাদের। সৃষ্টির নেতিবাচক অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে আজ তারা দিনের পর দিন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে মরণব্যাধি করোনার সঙ্গে বেঁধেছেন গাঁটছড়া। সামাজিক দূরত্বের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে তারা নেমেছেন রাস্তায়। কোভিড-১৯ নিয়ে আতঙ্কিত মানুষের মধ্যকার ভয় অতিক্রম করে সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে এবং সবাইকে সচেতন করে তুলতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তারা যতটা ধীরস্থিরভাবে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, নিঃসন্দেহে তা প্রশংসার দাবিদার।

‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা সর্বত্র আমরা দেশের তরে’—এই মূলমন্ত্র বুকে লালন করে গড়ে ওঠা আস্থার প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। যারা তাদের কর্মদক্ষতা ও মেধা দিয়ে কেবল দেশে নয়, সমস্ত পৃথিবীতে প্রশংসা অর্জন করেছে। আর করোনা মোকাবিলার এই সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন—এক কথায় প্রান্তিক পর্যায়ে জনমনে সচেতনতা তৈরি, চিকিত্সাসেবা প্রদান ও লকডাউন কার্যকর করার পাশাপাশি দুস্থ-অসহায়দের খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করার কাজটি করে চলেছে সেনাবাহিনী। দেশপ্রেম আর মানবিক বোধ থেকেই মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেরা বিনা মূল্যে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছেন। শুধু কি তাই! টহলে থাকা অবস্থায় ঘর থেকে বের হওয়া মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা, গাড়ি থামিয়ে কথা বলা এবং নির্ধারিত পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে দিয়ে সড়কে বের হওয়া গাড়ির চারপাশে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দেওয়ার কাজটি সযত্নে করছে তারা। তারা রোদ, বৃষ্টি ও ঝড় উপেক্ষা করে সড়কে সড়কে টহল দিয়ে সাধারণ মানুষকে যেমন সতর্ক করছে, তেমনি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতেও কঠোর না হয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপে জয় করেছে দেশের মানুষের হূদয়।

করোনা ভাইরাস পরম আপনজনকে দূরে সরিয়ে দিলেও ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, সেনাবাহিনী নিঃশেষে প্রাণদানে প্রস্তুত রয়েছে বীর সেনানী কিংবা নায়কের মতো। সেই সঙ্গে সাংবাদিক বা মিডিয়াকর্মী, অ্যাম্বুলেন্সচালক, লাশবাহী গাড়ির চালক, লাশ সত্কারে এগিয়ে আসা বিভিন্ন সংস্থা বা স্বেচ্ছাসেবক, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ অনেকেই এগিয়ে এসেছেন সাহসিকতার সঙ্গে। করোনার ভয়কে দুমড়ে-মুচড়ে উচ্চে তুলে শির তাদের প্রত্যেকের একটাই শপথ—প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে সামাজিক দূরত্বের মাধ্যমে গোলকের সব প্রান্ত ছুঁয়ে হলেও মানুষকে মৃত্যু থেকে জীবনের পথে ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের। আর তাদের এই শপথের মধ্য দিয়েই তারা হয়ে উঠেছে করোনাকালীন যুগান্তের সাহসী দীপ্তি।

n লেখক :কথাসাহিত্যিক ও নারীনেত্রী