শাহীন আহমেদ
এদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানোর পেছনে অভিভাবকদের যে মানসিকতাটা বেশি কাজ করে, তা আর কিছু নয়, ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করে নামজাদা প্রতিষ্ঠানের সম্মানজনক কোনো চাকরি হাতিয়ে নেবে। আর এজন্যই মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিজ্ঞানের ব্যবহারিক বিষয়গুলোতেই তাদের যত ঝোঁক। পারতপক্ষে কোনো অভিভাবকই চান না তাদের সন্তান বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করুক।
অবশ্য তাদের এমন চিন্তার পেছনেও যথেষ্ট যুক্তি আছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর কর্মক্ষেত্র নেই বললেই চলে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নামমাত্র গবেষণার বাইরে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে তৈরি গবেষণাক্ষেত্র খুবই কম। এ কারণে শিক্ষার্থীদের একটা বড়ো অংশই তাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে। বিজ্ঞানের অসাধারণ সব বিষয়ে নিজেদের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার বদলে তাদের বৃহত্ একটি অংশের একচেটিয়া চিন্তা থাকে কোনো রকমে স্নাতকের পাট চুকিয়ে বিসিএস দেওয়া।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো ‘ব্যানবেইসের’ তথ্যমতে, দেশের ৩৭ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই নেই বিজ্ঞানাগার। যেসব বিদ্যালয়ে নামমাত্র কিছু যন্ত্রপাতি সংবলিত বিজ্ঞানাগার রয়েছে, সেখানেও শিক্ষকদের যথাযথ অভিজ্ঞতা ও অনিহার কারণে এসবের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞানের বইগুলোকে আরো আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক করে উপস্থাপন করতে হবে। নতুবা বরাবরের মতো কঠিন কঠিন সব শব্দের কটমটে বিষয়গুলো বাধ্য হয়ে রাত জেগে পড়তে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে বিজ্ঞান সম্পর্কে যে ভীতি সৃষ্টি হয়, সেটি ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের জন্য মোটেও সুখকর হবে না।
বর্তমান যুগ জ্ঞানবিজ্ঞানের যুগ। এ যুগে একটি জাতির ভবিষ্যত্ বলে দেওয়ার জন্য তাদের বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার দিকে দৃষ্টিপাত করাই যথেষ্ট। চীন, জাপান এশিয়ার দুটি দেশ উন্নতির চরমে পৌঁঁছেছে। তার পেছনেও অবদান বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও ইদানীং জ্ঞানবিজ্ঞানে অসাধারণ উত্কর্ষ সাধন করেছে। তবে আশার কথা, গণিত অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির মতো কিছু সংগঠন আমাদের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমুখীকরণে কাজ করে যাচ্ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল?
সরকারি উদ্যোগে বৃহত্ পরিসরে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করে তোলা প্রয়োজন। নতুবা অদূর ভবিষ্যতে বিজ্ঞানে এ পশ্চাত্মুখী যাত্রা আমাদের উন্নত বিশ্ব থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়