তাজুল ইসলাম রেজা, গাইবান্ধা প্রতিনিধি
গাইবান্ধায় বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুমে প্রতিদিন বিকালে আকাশ কালো করে অঝোর ধারায় ঝরছে বৃষ্টি, সেই সঙ্গে বইছে ঝড়ো হাওয়া। এই মন্দ আবহাওয়ায় ফসলহানির ভয়ে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কোনো ক্ষতি হওয়ার আগেই কৃষক তার অতি কষ্টে উত্পাদিত ফসল ঘরে তুলতে চাইছে, না হলে যে তাকে পরিবারপরিজন নিয়ে সারা বছর না খেয়ে থাকতে হবে। তাই বোরো ধান কাটায়, মাড়াইয়ের কাজে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে এই অঞ্চলের কৃষকেরা। তবে বিরূপ আবহাওয়ার বিপরীতে চলতি বোরো ধান কাটার মৌসুমে গাইবান্ধায় অন্য বছরের মতো কৃষি শ্রমিকের তীব্র সংকট নেই। ধান কাটার জন্য কৃষি শ্রমিক সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। মজুরিও অন্যান্যবারের চেয়ে কম- সর্বনিম্ন দৈনিক ৩০০ টাকা।
করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলের কৃষিশ্রমিকরা পরিবহনের অভাবে অন্য জেলায় ধান কাটতে যেতে পারেনি। তাই এবার এখানে কম মজুরিতে কৃষিশ্রমিক মিলছে। গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলার সাতটি উপজেলায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। তবে চাষ হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। চাল উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। পুরো মে মাসই এখানে বোরো ধান কাটার উপযুক্ত সময়।
জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত জেলায় শতকরা ১২ ভাগ অর্থাত্ ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। ধান কাটার জন্য কম মজুরিতে সহজেই কৃষি শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে। গাইবান্ধায় সাধারণত কৃষিশ্রমিকের একদিনের মজুরি ৪৫০-৫০০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে ৩০০-৩৫০ টাকায় কৃষিশ্রমিক মিলছে। বিভিন্ন পেশার লোকজন ধান কাটতে যোগ দেওয়ার কারণেও এমনটি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাদুল্লাপুর উপজেলার খোর্দ্দ পাটানোছা গ্রামের ইজিবাইকচালক আংগুর মিয়া বলেন, লকডাউনের কারণে গাড়ি চালাতে পারছি না। তাই ৩৫০ টাকা দিন মজুরিতে ধান কাটছি। ধাপেরহাট ইউনিয়নের হাছানপাড়া গ্রামের রিকশাভ্যানচালক ছোলায়মান মিয়া (৪৮) বলেন, চারদিকে করোনা। ধান কাটা ছাড়া আর অন্য কোনো কাজ নাই। তাই বেকার হয়ে বসে থাকার চেয়ে ৩৫০ টাকা দিন মজুরিতেই ধান কাটছি। একই গ্রামের কৃষিশ্রমিক ফজলু মিয়া (৪০) জানান, গত বছর ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দিন মজুরিতে ধান কেটেছি। কিন্তু এ বছর করোনা ভাইরাসের কারণে জমির মালিকরা সহজে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়ায় ৩৫০ টাকার বেশি দিচ্ছে না।
ফুলছড়ি উপজেলার রসুলপুর গ্রামের কৃষক হাসেম মিয়া (৪৮) বলেন, আমাদের গ্রামের অনেক কৃষিশ্রমিক ধান কাটা মৌসুমে অন্য এলাকায় গিয়ে কাজ করেন। এ বছর করোনার কারণে কৃষিশ্রমিকরা অন্য জেলায় কাজে যেতে পারেনি। তাই কৃষিশ্রমিকের সংকট দেখা দেয়নি। তিনি আরো বলেন, আমি এবার ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। এলাকায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। সুলভ মূল্যে কৃষিশ্রমিক দিয়ে ধান কাটছি।
গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মাসুদুর রহমান বলেন, জেলার সাতটি উপজেলায় ১ লাখ ১৬ হাজার কৃষিশ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে করোনাকালে ৮ হাজার ৩২৭ জনকে প্রত্যয়ন দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া জেলায় ধান কাটার জন্য ১৬টি হারভেস্টার মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। একটি হারভেস্টার প্রতি ঘণ্টায় ৩ বিঘা জমির ধান কাটতে পারে। ১ বিঘার ধান কাটতে খরচ পড়ে মাত্র ১ হাজার টাকা। ফলে ধান কাটতে কোনো সমস্যা হবে না।