উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডায়াবেটিস। যা প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগ। ডায়াবেটিস সবার সব বয়সেই হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশে এই রোগে আক্রান্তের হার বাড়ছে। প্রতিটি পরিবারেই রয়েছে ডায়াবেটিস রোগীকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। এই ব্যয়বহুল রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজন জীবনাচরণে পরিবর্তন আনা।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪২ কোটিরও বেশি। আশার কথা এই যে, এই রোগ ৮০ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এখনি যদি এই রোগ প্রতিরোধ করা না যায়, তাহলে ২০৪০ সাল নাগাদ ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৬৪ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে ৭৩ লাখেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। যাদের প্রায় অর্ধেকই নারী। এছাড়া ডায়াবেটিস আছে এমন অর্ধেকেরও বেশি মানুষ জানেই না যে তার ডায়াবেটিস আছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শতকরা ২০ ভাগ নারী গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। যাদের ৬৫ শতাংশই পরবর্তীকালে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের ও তার গর্ভের শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ ছাড়া গর্ভকালীন ডায়াবেটিস যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তবে তাদের পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি আরো বেশি থাকে।
এ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আজ ১৪ নভেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে—‘ডায়াবেটিস প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগ’। ডায়াবেটিস সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি করাই এই দিবসের লক্ষ্য।
‘ডায়াবেটিস প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগ’—এই প্রতিপাদ্য বিষয়ে অধ্যাপক ডা. আজাদ খান বলেন, বাংলাদেশসহ পৃথিবীতে এমন পরিবার নেই, যে পরিবারে অন্তত একজন ডায়াবেটিক রোগী কিংবা ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছেন এমন মানুষ নেই। ফলে কোনো পরিবারে ডায়াবেটিক রোগী থাকলে তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিংবা পরিবারের কেউ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে থাকলে তার প্রতিকার নিয়ে উদ্বেগ থাকাটা স্বাভাবিক। সে কারণে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি শুরু থেকেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। সমপ্রতি সমিতি এ লক্ষ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং অনন্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
এরমধ্যে ‘গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা’ প্রকল্প। এর আওতায় ইতোমধ্যে ৪০০ কাজীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা পরিকল্পিত গর্ভধারণের ব্যাপারে নবদম্পতিদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। সারা দেশে ৫০টি ‘গর্ভধারণ-পূর্ব সেবা-কেন্দ্র’ চালু হযেছে। যেখানে নারীরা স্বল্পমূল্যে গর্ভধারণ সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। ফলে প্রসবকালীন নারী ও শিশুমৃত্যুর হারও কমানো সম্ভব হবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে সারা দেশে প্রশিক্ষিত ৪০০ কাজী ও ৩০০ চিকিত্সক এ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। গর্ভবতী মায়েদের অপুষ্টি থাকলে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস হবার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ। এ রোগ কখনো সম্পূর্ণ সারে না। কিন্তু, চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে নির্ধারিত নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চললে এবং প্রয়োজনে পরিমাণ মতো ওষুধ গ্রহণ করলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ ও প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে গতকাল বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে বক্তব্য রাখেন বাডাস’র সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান, বারডেমের মহাপরিচালক অধ্যাপক জাফর আহমেদ লতিফ। সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়— বর্তমানে দেশের ৭৩ লাখ ডায়াবেটিক রোগীর মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ যা প্রায় শতকরা ৬২ ভাগ ডায়াবেটিক রোগীকে ডায়াবেটিস-সেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে ডায়াবেটিস সমিতি নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে— সকাল সাড়ে ৮টায় শোভাযাত্রা। সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত বিনামূল্যে ডায়াবেটিস নির্ণয়, জাতীয় জাদুঘরের সামনে, ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে এবং এনএইচএন ও এইচসিডিপি’র বিভিন্ন কেন্দ্র সংলগ্ন স্থানে। দুপুর ১২ টায় বারডেম মিলনায়তনে আলোচনা সভা। এছাড়া সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ৪র্থ তলায় বিনামূল্যে হূদরোগীদের পরামর্শ প্রদান। শুক্রবার সকাল ১০টায়, দিবসটি উপলক্ষে শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।