জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানী ইউনিয়নের খোলাবাড়ীর চর এলাকায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহারই মধ্যে খোলাবাড়ী, বরখাল, গুচ্ছগ্রামসহ খোলাবাড়ী চর বাজারটি গত সপ্তাহে যমুনায় বিলীন হইয়াছে। ভাঙনের হুমকিতে রহিয়াছে ৫ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাহাদুরাবাদ ঘাট নৌ-থানার তিনতলা ভবনটিও। গত বত্সর ৬ এপ্রিল এই থানাটি উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। উদ্বোধনের সময় নদী হইতে ইহার দূরত্ব ছিল ৫০০ গজ। এখন মাত্র ২০ হইতে ২৫ গজ। ইহার আগে খোলাবাড়ীর চর এলাকার দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি মসজিদসহ অনেক ঘরবাড়ি, গাছপালা ও হাজার একর ফসলি জমি তলাইয়া গিয়াছে নদীগর্ভে। শুধু জামালপুর নহে, এই সময় গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন পরিলক্ষিত হইতেছে। গত দুই সপ্তাহে তিস্তায় বিলীন হইয়াছে শতাধিক একর জমি-বাড়ি। সাংবাত্সরিক এইরূপ নদীভাঙনে আমাদের প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি হইতেছে। কিন্তু নদীভাঙনে জানমালের ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, তাহা নিয়া আমাদের গভীর চিন্তাভাবনার অভাব রহিয়াছে।
প্রথমত নদীমাতৃক দেশে নদীভাঙন দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। প্রতিনিয়ত পলিমাটি জমিয়া যাইবার কারণে আমাদের নদীগুলির রুট ও গতিবিধি ঠিক রাখা যায় না। ইহাতে নদীর ভাঙন ত্বরান্বিত হয়। নদীর গতিপথ ঠিক রাখিতে হইলে নিয়মিত ড্রেজিং করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার এই ব্যাপারে নানা পদক্ষেপ নিয়াছে যাহা আশাব্যঞ্জক। এমনকি বেসরকারি পর্যায়ে নদীর ড্রেজিং করিবারও ব্যবস্থা করা হইয়াছে। কিন্তু ড্রেজিং করিলেও পলি জমিয়া নদীর বুক আবার ভরাট হইয়া যাইতেছে। এমতাবস্থায় শুধু জিওব্যাগ ফেলিয়া নদীর ভাঙন রোধ করা অসম্ভব। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এইভাবে কোটি কোটি অর্থ জলে ফেলা হয় বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। এইজন্য আমরা বরাবরই বলিয়া আসিতেছি যে, নদীর তীরে যে কোনো স্থায়ী-অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের আগে পরিকল্পনা গ্রহণ ও সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া সয়েল টেস্ট বা মাটি পরীক্ষা না করিয়া সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা সমীচীন নহে। এমনকি নদীর মধ্যেও ঘরবাড়ি নির্মাণ করা যায়, যদি ঠিকমতো সয়েল টেস্ট করিবার পর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায়। যেমন—ভারতের রাজস্থানে অবস্থিত ওয়াটার প্যালেস বা জলমহাল তাহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু আমাদের দেশে নদীতীরবর্তী স্থানে থানা, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা, মসজিদ-মন্দির, হাসপাতাল, পাকা ঘরবাড়ি ইত্যাদি নির্মাণে সাধারণত সয়েল টেস্টকে তেমন গুরুত্বই দেওয়া হয় না। ফলে প্রতি বত্সর নদীভাঙনে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়িতেছে।
বাংলাদেশে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর বা স্থাপনা আছে, যাহাতে বাঁধ ও শক্ত করিয়া উঁচু দেওয়াল তুলিয়া রক্ষা করা প্রয়োজন। কিন্তু যত্রতত্র স্থানে বাঁধ দিয়া রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কাম্য নহে। তাহার চাইতে নদীতীরবর্তী এলাকায় ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণকে যথাসম্ভব নিরুত্সাহিত করা প্রয়োজন। একান্ত প্রয়োজনে সেখানে টিন, কাঠ ইত্যাদির অস্থায়ী বাড়িঘর নির্মাণ করা যায়। স্থায়ী ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করিতে হইলে সয়েল টেস্টপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হইবে, নতুবা কোনো স্থাপনাই টেকসই হইবে না। আলোচ্য নৌ-থানাটি নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত নেওয়া হয় নাই বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। এইভাবে তো দেশ চলিতে পারে না। সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হইলে এই ধরনের ক্ষতির শিকার আমাদের বারংবার হইতে হইবে।