শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন
অক্টোবর থেকে চলা বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার মুখে পাঁচ মাস প্রধানমন্ত্রীহীন থাকা ইরাকের সংসদ নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে পেরেছে। গত বুধবার ইরাকের সংসদ নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাদ্দাম হোসাইনবিরোধী সাংবাদিক, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ও মার্কিনপন্থি বলে পরিচিত মোস্তফা আল কাজেমিকে নির্বাচিত করেছে।
বেকারত্ব দূরীকরণ ও সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত ১ অক্টোবর থেকে গড়ে উঠা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে নভেম্বরে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী আদিল আব্দুল মাহদি। এরপরে প্রেসিডেন্ট বারহাম সালেহ মুহাম্মদ তৌফিক আলাউ ও আদাসা আল জুরফিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন দিলেও তারা সংসদ থেকে আস্থা ভোটে জিতে আসতে পারেননি। আল জুরফি বিরোধীদের কাছে ইরানপন্থি বলে সমালোচনার মুখে জিততে পারেননি। প্রেসিডেন্ট মনোনীত তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে আল কাজেমি আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে আসেন। আল কাজেমির প্রস্তাবিত ২২ সদস্যের মন্ত্রীসভার মধ্যে ১৫ জন আস্থা ভোটে জয়ী হয়ে আসেন। তবে এখনো খালি রয়েছে তেল ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়।
গত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী এই বিক্ষোভে সরকারি হিসেবে শতাধিক নিহত ও ৬ হাজারেরও বেশি আহত হয়েছে। ইরাকের ৪০ শতাংশ শিক্ষিত লোক বেকার। প্রশাসনিক দুর্নীতি চরমে। স্বাস্থ্য পরিষেবা নাজুক। পুরা ইরাকে তীব্র বিদ্যুত্ সংকট। ওপেকভুক্ত এই দেশ প্রতিদিন ৩৬ লাখ ব্যারেল তেল উত্পাদন করলেও জনগণের জীবন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সম্মুখীন। পর্যাপ্ত উন্নয়ন ও জনকল্যাণে সরকার ব্যর্থ। ফলে এসব পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তরুণদের বিক্ষোভ ও সহিংসতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ইরাকের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অখুশি। ইরাকের ইরানের প্রতি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না মানা, সিরিয়া-ইরাক সীমান্ত ওপেন রাখা এবং সর্বশেষ রাশিয়া থেকে এস-৩০০ এবং এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার উদ্যোগ মার্কিন শিবিরকে বিচলিত করেছে। ফলে এই বিক্ষোভকে পুঁজি করতে চেয়েছে পশ্চিমা ও সৌদি জোট।
জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মোস্তফা আল কাজেমি নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলেন, তার কাজ সংকট সমাধান করা, সংকট তৈরি করা নয়।
ইরাকের ইরানপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইরাকি ফাতাহ জোট শুরুর দিকে আল কাজেমিকে ভ্যাটো দিয়েছিল। এই জোট ইরাকের সংসদে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি ও তেলের মূল্য হ্রাসের কারণে আল ফাতাহ ও আল কাজেমি একটি রাজনৈতিক অংশীদারিত্বে আসতে সম্মত হয়। নতুন সরকারকে নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ইরাকের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিক্ষুব্ধ তরুণদের চাকরি দেওয়া, ইরান-মার্কিনের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বাজেট সংকুলান।
ইরাকের অর্থনীতির ৬৭ শতাংশই জোগান দেয় তেল বাণিজ্য। জাতীয় বাজেটের ৯০ শতাংশ আসে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আয় থেকে। কিন্তু করোনা ভাইরাসে বিশ্বব্যাপী লকডাউন ও তেলের বাজার দর পতনে জাতীয় বাজেট জোগান দিতেই হিমশিম খাবে নতুন সরকার। বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো তেল আমদানিকারক ও ইরাকের সবচেয়ে বড়ো তেল বাণিজ্য অংশীদার চীন গত জানুয়ারি থেকে লকডাউনে থাকার ফলে ইরাকের তেল রপ্তানি আয় হুমকির মুখে। সৌদি যুবরাজের তেলের দর নিয়ে বাক যুদ্ধের ফলে তেলের মূল্য এখন ব্যারেল প্রতি ২৫-৩০ ডলারে নেমে এসেছে। ২০২০ সালের বাজেটে ইরাক তেলের রপ্তানি মূল্য ধরেছে ব্যারেল প্রতি ৫৫ ডলার। বিশ্বব্যাংক তাদের হিসেবে বলছে বর্তমানে তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ৩০ ডলারের নিচে নেমে আসায় ইরাকে চলতি বছরে বাজেট সংকট দেখা দিবে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার।
ইরাকের সংসদে ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরাতে বিল পাশ হয়েছে। ফলে মোস্তফা আল কাজেমিকে ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরাতে উদ্যোগী হতে সংসদের চাপে থাকতে হবে। ইরাকের সীমান্তবর্তী ও মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে আল কাজেমিকে দেওয়া সমর্থনের বিনিময়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অর্জন ঘরে তুলে আনার চেষ্টা করবে। ফলে কঠিন ও সতর্ক ভারসাম্য সম্পর্কে এগুতে হবে আল কাজেমি সরকারকে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়