দিশাহীন সময়

পৃথিবীতে আসিয়াছে এক বিদঘুটে সময়। ২০২০ সালের শুরু হইতেই সারা বিশ্বকে যে এক নূতন পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে হইতেছে, তাহা জীবিত কোনো মানুষের দেখিবার মতো দুর্ভাগ্য আগে হয় নাই। আমরা কেহ কেহ স্প্যানিশ ফ্লুর কথা শুনিয়াছি, বইপুস্তকে হয়তো পড়িয়াছি। সেই ফ্লু আসিয়াছিল বিংশ শতাব্দীর গোড়ায়, ১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে এবং তাহা সরাসরি দুই বত্সর পর্যন্ত থাকিয়া প্রায় ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটাইয়াছিল। সংক্রমিত হইয়াছিল প্রায় ৫০ কোটি মানুষ। বিশ্বের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ হইতে ৮ শতাংশ হ্রাস পাইয়াছিল। তত্কালীন সময়ের বড়ো বড়ো কোম্পানি ৪০ হইতে ৭০ শতাংশ লোকসানের সম্মুখীন হইয়াছিল। অথচ তখন শিল্পের সহিত জড়িত মানুষের সংখ্যাও ছিল হাতেগোনা। গোটা বিশ্বের মানুষের সংখ্যাও ছিল ২০০ কোটির কিছু কম।

কিন্তু ২০২০ সালের বিশ্বজনসংখ্যা ৭০০ কোটির অধিক। ১০০ বত্সরে পৃথিবীতে তৈরি হইয়াছে বহু রকমের শিল্পকারখানা, তৈরি হইয়াছে প্রাইভেট খাতের উদ্যোগ। ১০০ বত্সরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ যোগাযোগ বাড়িয়াছে শতসহস্র গুণ। তখন সদ্যই বিভিন্ন দেশের সরকারের অধীনে এয়ারলাইনারগুলি আকাশে উড়িতে শুরু করিয়াছিল। কিন্তু এখন দেশে দেশে রহিয়াছে বিশাল বিশাল প্রাইভেট এভিয়েশন কোম্পানি। ফ্লাইটরাডার২৪-এর মতে, করোনাপূর্ব সময়ে যে কোনো মুহূর্তে ২০ হাজার যাত্রীবাহী প্লেন আকাশে উড়িতে থাকে। আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট হইতে শুরু করিয়া পত্রিকাও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসাবে স্বীকৃত।

বাংলাদেশও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলাইয়া আগাইয়াছে। ১৯৭২ সালে আমাদের বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকার। ২০১৯-২০ অর্থবত্সরে তাহা আসিয়া দাঁড়াইয়াছে ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটিতে। কিন্তু এই করোনা ভাইরাস সরকার, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, চাকুরিজীবী সকলের সম্মুখেই বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞকে থমকাইয়া দিয়াছে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই সময় একটি গভীর ফাঁদে পড়িয়াছেন সত্যিকারের শিল্পোদ্যোক্তারা। তাহাদের ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা। ধরা যাউক, একটি প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের সর্বসাকল্যে বেতনভাতা দিতে শুরু করিয়াছিল ২০ বা ৩০ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠান যত বড়ো হইয়াছে, শ্রমিকের মজুরি বাড়িয়াছে, ইনক্রিমেন্ট প্রদান করিতে হইয়াছে। সেই সঙ্গে সরকারের নির্ধারিত হারেও মজুরি ও ভাতা বাড়াইতে হইয়াছে। কিন্তু ইহাতেও অনেক উদ্যোক্তা তাহা চালাইয়া যাইতে পারিয়াছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাহাদের ‘আয় নাই খরচ আছে’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হইয়াছে। অধিকন্তু একদিকে দায়িত্ববোধ, অন্যদিকে বাস্তবতা সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। যে অবস্থা দাঁড়াইয়াছে, তাহা সেই স্প্যানিশ ফ্লু-জনিত মহামারিকে ছাড়াইয়া গিয়াছে। অর্থাত্ আধুনিক অর্থনীতির গতি যে রকম তীব্র, ঠিক তেমনি ইহার ধাক্কাটিও সজোরে লাগিতে শুরু করিয়াছে। ইহা সকলের জন্য স্মরণে রাখাই উত্তম।