ঢাকার আশেপাশে শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ

নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ এবং মুন্সীগঞ্জসহ ঢাকার আশেপাশের জেলাগুলোতে গতকাল রবিবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কোন কোন স্থানে ভোটার সিরিয়াল না পেয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন ভোটাররা।

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ জানান, নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আড়াইহাজারে সাতগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদের উকিল নামের একজন পোলিং এজেন্ট ছুরিকাহত ও বন্দরের কুশিয়ারা ভদ্রাসন কেন্দ্রে শিবিরের হামলায় ৬ জন জাপা সমর্থক আহত হওয়ার ঘটনা ছাড়া জেলার কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে ৫টি আসনেই ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী এজেন্টদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। তবে শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রে ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট দেখা গেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা ছিল চোখে পড়ার মত। নির্বাচন সম্পর্কে মহাজোটের প্রার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামীম ওসমান নির্বাচন শেষে বলেন, নারায়ণগঞ্জে নজিরবিহীন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপির পোলিং  এজেন্ট  সকল কেন্দ্রেই ছিল তবে এই আসনের ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী (জমিয়তে ইসলামের) মুফতি মনির হোসেন কাসেমীকে ভোট দিতে দেখা যায়নি।

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মহাজোটের প্রার্থী সেলিম ওসমানও বলেন, নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। তবে এই আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী এসএম আকরাম নির্বাচনকে জালিয়াতির নির্বাচন উল্লেখ করে বলেন, প্রশাসন মহাজোটের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করেছে। আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখা হয়েছিল। অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মান্নান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের খেলাফত মজলিস প্রার্থী হাফেজ কবির দুপুরেই নির্বাচন বর্জন করেন। 

গতকাল রবিবার সকাল ৮টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। সারাদিনে কোথাও কোনো গোলযোগের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন কেন্দ্রে ধানের শীষের এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অনেক জায়গায় ভোটার সিরিয়াল না পাওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়েন সাধারণ ভোটাররা। অনেককেই ক্ষুব্ধ হয়ে ভোট না দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে দেখা গেছে।

ভোটকেন্দ্রগুলোতে সকালে শীতের কারণে ভোটার কম থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে মহাজোট ও ঐক্যফ্রন্টসহ বিভিন্ন দলের ৩৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ৫টি আসনের ৭৪৫টি কেন্দ্রে মোট ভোটার ২০ লাখ ৩৪ হাজার ২৪৫ জন।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, পাঁচ স্তরের নিরাপত্তার মধ্যে দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া গাজীপুরে শান্তিপূর্ণভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে দুপুর পৌনে ২টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর হাড়িনাল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে সহিংসতায় স্থানীয় কাজী আজিম উদ্দিন কলেজ ছাত্রসংসদের সাবেক ভিপি মোঃ লিয়াকত হোসেন (৪০) নিহত হয়েছেন। এসময় আরও তিনজন আহত হন। এ ছাড়া, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভানুয়া সরকারি প্রাথমিক কেন্দ্রের বাইরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে র্যাব, বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হাঙ্গামার ঘটনায় ২০ মিনিটের মতো ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয় বলে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ড. ইবনে সৈয়দ মো: হারুনুর রশীদ জানিয়েছেন।

সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে গাজীপুরের ৫টি সংসদীয় আসনের মোট  ৯২২টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। নির্বাচনে পাঁচটি আসনে মোট ৩২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটকেন্দ্রগুলোতে সকালেই অনেকে ভোট দিতে চলে যান। মহিলা ভোটারদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে দেখা যায়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভোটারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সিটি কর্পোরেশনের সালনা নাসির উদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের ৫নং কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মোঃ জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, এ কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ৩১২৯জন। বেলা ১২টা পর্যন্ত ৬টি বুথে এক হাজার ২০০ ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে ধানের শীষের কোনো এজেন্ট ছিল না।

৬নং কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার পার্থ সারথী গুহ জানান, এ কেন্দ্রে বেলা ১টা পর্যন্ত ৩১২৭ জন ভোটারের মধ্যে ৯৩০ জন ভোট দিয়েছে। এ কেন্দ্রেও ধানের শীষের এজেন্ট ছিল না। একই কলেজে ৩নং কেন্দ্রে ২,৯১৩ জন ভোটারের মধ্যে ৫টি বুথে বেলা ১টা পর্যন্ত ৮৫০ জন ভোট প্রদান করে। 

এ দিকে, গাজীপুরের পাঁচটি আসনের প্রধান দুই দলের ১০জন প্রার্থী বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন। এর মধ্যে গাজীপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি সকাল ৯টায় গাজীপুর মহানগরের জয়দেবপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এবং বিএনপির চৌধুরী তানভীর আহমদ সিদ্দিকী সকাল ৯টায় কালিয়াকৈরের শেওড়াতলী ভূবেনশ্বর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট প্রদান করেন।

গাজীপুর-২ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি সকাল ৯টায় টঙ্গীর নোয়াগাঁও এমএ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং বিএনপির সালাহ উদ্দিন সরকার বেলা ২টায়  টঙ্গীর দত্তপাড়া এলাকার টঙ্গী ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দেন।

গাজীপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইকবাল হোসেন সবুজ ভোট দেন শ্রীপুরের দমদমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে সকাল সোয়া ৮টায়। জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থী কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ইকবাল সিদ্দিকী সকাল ৯টায় রাজেন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন।

গাজীপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সিমিন হোসেন রিমি এমপি সকাল পৌনে ১০টায় ভোট দেন তার গ্রামের বাড়ির পাশেই দরদরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এবং বিএনপির প্রার্থী শাহ রিয়াজুল হান্নান ভোট প্রদান করেন সকাল সাড়ে ১০টায় কাপাসিয়ার ঘাঘটিয়ার চালা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে।

গাজীপুর-৫ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি ভোট দেন সকাল ৯টায় কালীগঞ্জে নোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এবং বিএনপির প্রার্থী একেএম ফজলুল হক মিলন কারাবন্দি থাকায় তিনি তার ভোট দিতে পারেননি।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মানিকগঞ্জে দুএকটি কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া জেলার ৩টি  নির্বাচনী আসনে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি ও গণফোরামের প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন তাদের অনেক পোলিং এজেন্টকে  কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অনেক কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে ঢুকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাধার কারণে।

তারা আরও অভিযোগ করেন, ভোটের আগের দিন রাতেই আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে অবৈধভাবে ব্যালটে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে ভোটবাক্সে ফেলে গেছে। এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এনায়েত হেসেন টিপু ও পৌর আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুপক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহিদ মালেক স্বপন সকাল ১০টার দিকে গড়পাড়া নিউ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট প্রদান করেন। এ সময় তিনি বলেন, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে জনগণ নৌকায় ভোট দিবেন।

অপরদিকে সকাল ৮টায় মানিকগঞ্জ-১ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী নাঈমুর রহমান দুর্জয় বৈকণ্ঠপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও মানিকগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মমতাজ বেগম জয়মন্টপ উচ্চ বিদ্যালয়ে তাদের ভোটাধিকার  প্রয়োগ করেন।

বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সকালেই ভোটাররা কেন্দ্রে ভোট দিতে আসতে শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। তবে দুপুরের পর অধিকাংশ কেন্দ্র ছিল প্রায় ভোটার শূন্য। মানিকগঞ্জ-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল হামিদ ডাবুল বেলা ১১টার দিকে অভিযোগ করেন তার পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। সেই সঙ্গে ভোটারদের ভোট প্রয়োগে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অনেক কেন্দ্রে ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট দেখা গেলেও অধিকাংশ কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট কেন্দ্রে যায়নি বলে দাবি প্রিজাইডিং অফিসারদের।

এদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকায় পশ্চিম সেওতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও  ঐক্যফ্রন্ট কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়। এদের মধ্যে ৬ জনকে মানিকগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, রবিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত জেলার ৬ উপজেলার তিনটি আসনে ভোট গ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়। তবে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের শ্রীনগরের ষোলঘর কেয়টখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে প্রতিপক্ষের হামলায় আব্দুর রশিদ (৪০) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী আহত হন।

এদিকে মুন্সীগঞ্জ-১ আসন (সিরাজদিখান-শ্রীনগর) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (হাতপাখা প্রতীক)-এর প্রার্থী কে. এম আতিকুর রহমান গতকাল বেলা ১২টার দিকে সিরাজদিখানে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে তিনি ভোট কারচুপি, পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া, কক্ষের গোপন কক্ষে প্রবেশ না করে প্রকাশ্যে টেবিলে ভোট দেওয়া এবং প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেন। ভোটশেষে বিকালে তিনি সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে নির্বাচন স্থগিত করার জন্য একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। তবে চিঠিতে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল না।

জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার সায়লা ফারজানা জানান, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসন থেকে ৮টি, মুন্সীগঞ্জ-২ আসন থেকে ২টি ও মুন্সীগঞ্জ-১ আসন থেকে ৭টি অভিযোগ আসে। প্রতিটি অভিযোগেরই সুষ্ঠু নিষ্পত্তি করা হয়েছে।