করোনার অভিঘাতে মানসিক স্বাস্থ্য

গোটা বিশ্বে এখন আতঙ্কের একটাই নাম করোনা ভাইরাস। ইহাতে দুশ্চিন্তা, অবসাদ ও বহুমুখী মানসিক চাপও বাড়িতেছে পাল্লা দিয়া। একই কারণে বাড়িতেছে আত্মহত্যার প্রবণতাও। আতঙ্কের কারণে যখন একরকম স্তব্ধ ব্যাবসায়িক বিনিয়োগসহ সামগ্রিক বাণিজ্যিক লেনদেন, তখন এই মানসিক চাপ আর নিতে না পারিয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন খোদ জার্মানির অর্থমন্ত্রী থমাস শেফার। ইউরোপ-আমেরিকার অনেক চিকিত্সকও আত্মহত্যা করিয়াছেন প্রবল চাপের মধ্যে থাকিয়া। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে কয়েক জন করোনা রোগীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটিয়াছে। এমনকি আমাদের হাসপাতাল হইতে রোগীর পলায়নের ঘটনাও ঘটিয়াছে। ইউএনডিপির মতে, করোনা ভাইরাস দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মুখে নূতন এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট হইয়া দাঁড়াইয়াছে। মানসিক স্বাস্থ্যের উপর তাহার চাপ স্বভাবতই বাড়িতেছে।

এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইইডিসিআর এই করোনা দুর্যোগকালে আমাদের মানসিক শক্তি দৃঢ় রাখিবার উপদেশ দিয়াছে। দিনের পর দিন সেলফ বা হোম কোয়ারেন্টাইন কিংবা আইসোলেশনে থাকিবার কারণে অনেকের মানসিক ট্রমা তৈরি হইয়াছে। কিছুদিন পূর্বে আন্তর্জাতিক শিশুকেন্দ্রিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন ১৩টি উন্নয়নশীল দেশে ‘চিলড্রেন ভয়েসেস ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ শীর্ষক এক জরিপ পরিচালনা করে। ইহার ফলাফলে দেখা যায়, করোনা দুর্যোগকালে শতকরা ৯১ ভাগ শিশু ও তরুণ মানসিক চাপ ও যন্ত্রণার মধ্যে রহিয়াছে। মহামন্দা, যুদ্ধবিগ্রহ, দাঙ্গা, মরণব্যাধি ভাইরাস, মহামারি, খাদ্যসংকট, দুর্ভিক্ষ, বেকারত্ব প্রভৃতি কারণে মানুষের মনোবল যে কোনো সময় ভাঙিয়া পড়িতে পারে। বর্তমানে সোশ্যাল ডিসট্যান্স, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, পিপিই, মাস্ক, ভেন্টিলেটর ইত্যাদি শব্দও মানুষের মনে ভয়ের জন্ম দিতেছে। ব্যক্তি ও সমাজ-জীবনে তৈরি হইতেছে দুঃখ, কষ্ট, ভয়, আতঙ্ক, উদ্বিগ্নতা, রাগ, বিরক্তি, হতাশা, অপরাধবোধ, অসহায়ত্ব, একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা, স্নায়ুচাপ, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি। এই কারণে ২০০৩ সালে হংকংয়ে সার্স মহামারিতে বয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি পায় বলিয়া জানা যায়। 

বিশ্বব্যাপী সাড়ে প্রায় ৭০০ কোটি মানুষ ঘরবন্দি। এই সময় মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখিতে আমাদের করণীয়গুলি হইল—অসত্য সংবাদ ও গুজবে কান না দেওয়া, হাতের কাজের চর্চা করা, ব্যায়াম করা, ঠিকমতো ঘুমানো, বইপড়া, ধর্মীয় কাজে মনোনিবেশ করা, পরিবারের সদস্যদের সহিত ভালো সময় কাটানো, ঘরোয়া খেলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা, মানসিক অসংলগ্ন ব্যক্তিকে সাহস জোগানো, টেলিফোন বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে স্বজনদের খোঁজখবর রাখা, শিশুদের এক ঘণ্টার জন্য হইলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখিয়া একটু বাহিরে নিয়া যাওয়া, প্রয়োজনে সরাসরি বা অনলাইনে চিকিত্সকের পরামর্শ গ্রহণ করা ইত্যাদি। ইউরোপীয় দেশসমূহ এমনকি আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশের করোনা মোকাবিলায় উন্নত চিকিত্সার ব্যবস্থাসহ জনসাধারণের মানসিক শক্তি ধরিয়া রাখিতে গ্রহণ করিয়াছে নানা পদক্ষেপ। আমাদেরও এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, যাহাতে মানুষের ভয়, আতঙ্ক, খাদ্যাভাবের চিন্তা, দুর্দশাগ্রস্ত, নিরাশা ও অনুপায়কে প্রশমিত করে। একাকিত্বের বিষণ্নতাকে দূর করে। অমর্ত্য সেনের মতো আমরা আশাবাদী, লকডাউন হইতে আরো উন্নত সমাজ তৈরি হইবে।