করোনার ফাঁকে বাড়িতেছে অপরাধ

করোনায় অপরাধ বাড়িয়াছে নাকি কমিয়াছে? ইহার উত্তর একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না। বলা যায়, কিছু কিছু অপরাধ বৃদ্ধি পাইয়াছে আবার কিছু অপরাধ হ্রাস পাইয়াছে। সমীক্ষা অনুযায়ী আমাদের দেশের ৬৪০টি থানায় প্রতি বত্সর গড়ে ১ লক্ষ ৪০ হাজার অপরাধ রেকর্ড হয়। এই হিসাবে দিনে গড়ে প্রায় চার শত অপরাধ রেকর্ড হইবার কথা। কিন্তু এই পরিসংখ্যানের চিত্র কিছুটা পালটাইয়াছে করোনার কালবেলায়। অপরাধের সংখ্যা সামগ্রিকভাবে কমিয়াছে বিগত কয়েক মাসে। সহিংসতা তথা হত্যাকাণ্ডের অপরাধ কমিয়াছে, মাদক গ্রহণ ও চোরাচালান হ্রাস পাইয়াছে। তবে অর্থসংক্রান্ত দুর্নীতি ও অপরাধ বৃদ্ধি পাইয়াছে। এই তো গত রবিবার রাজধানীর সায়েদাবাদে জনসমক্ষে এক ব্যবসায়ীকে পিটাইয়া ৫৫ লক্ষ ৬৯ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়াছে।

এমনিতেই লকডাউনের সময় মানুষের সামগ্রিক শৃঙ্খলা বজায় রাখিতে মাঠে রহিয়াছেন দুই লক্ষাধিক পুলিশ সদস্য। করোনা মোকাবিলায় তাহারা অহর্নিশ দায়িত্ব পালন করিতেছেন। এই দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া এখন অবধি ১ হাজার ৮৭৮ জন পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হইয়াছেন। মারাও গিয়াছেন বেশ কিছু সদস্য। করোনার দিকে সকলের অধিক মনোযোগ থাকিবার  এই সুযোগ লইতেছে অনেক অপরাধী। বিশেষ করিয়া ঈদের কারণে গত ১০ মে হইতে লকডাউন শিথিল এবং দোকানপাট খুলিয়া যাইবার কারণে মানুষের আনাগোনা বাড়িয়াছে। বাড়িয়াছে অপরাধও। তবে সবচাইতে বেশি অপরাধ ঘটিতেছে নারীদের প্রতি। এই বিষয়ে ইতিমধ্যে সতর্কতা জারি করিয়াছে জাতিসংঘ ও নারী নির্যাতন বিষয়ে কাজ করা সংস্থাগুলি। জাতিসংঘ বলিতেছে, তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলিতে ঘরে যাহারা নিপীড়নের শিকার হন, তাহাদের ক্ষেত্রেও পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পাইয়াছে। অপরাধবিজ্ঞানীরা এই ক্ষেত্রে বলিয়াছেন যে লকডাউনের সময় পুরুষের বাহিরের পেশা ও অন্য কাজে ব্যস্ত থাকিবার সুযোগ কম থাকায় গৃহে নারীদের প্রতি কর্তৃত্ব স্থাপন করিবার ঘটনা অধিক ঘটিতেছে। আর তাহাতেই বাধিতেছে সংঘাত। এই ধরনের সহিংসতার পাশাপাশি সাইবার অপরাধও বৃদ্ধি পাইয়াছে। করোনা পরিস্থিতিতে বিভিন্ন অনলাইন বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান বহু ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের নিকট অধিক মূল্যে নিম্নমানের পণ্য বিক্রয় করিতেছে। অনলাইন প্রতারকেরা বিভিন্ন প্রলোভনে ও কৌশলে সাধারণ ক্রেতাদের ফাঁদে ফেলিতেছে।

প্রকৃতপক্ষে, অপরাধীদের কোনো নৈতিকতা থাকে না, যেইভাবেই হউক তাহারা অর্থ আত্মসাত্ করিতে চাহে।  এই জন্য তাহারা বৈশ্বিক মহামারিকে কাজে লাগাইয়া তাহাদের অপরাধের ধরনেও পরিবর্তন আনিয়াছে। করোনা আসলে সকল কিছুর মধ্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনিতেছে। করোনার এই দুর্বিষহ সময় আরো কত দিন চলিবে, তাহা কেহ জানে না। সুতরাং অপরাধের ধরনে আরো কত ধরনের পরিবর্তন আসিবে, তাহাও আমাদের নিকট স্পষ্ট নহে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করোনা মোকাবিলায় অধিক ব্যস্ত রহিয়াছে বিধায় এই সুযোগে প্রথাগত অপরাধীরা যাহাতে মাথাচাড়া দিয়া উঠিতে না পারে, সেই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলিকে আরো সতর্ক থাকিতে হইবে।