করোনায় স্থবির কৃষি অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারে খুলনা জেলা প্রশাসনের প্রয়াস

শুভেন্দু সরকার

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারীর তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। আর এ করোনাভাইরাসের ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশও। করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে সমগ্র বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশও গ্রহণ করেছে ‘ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন’ কর্মসূচি, যার কারণে রাস্তা-ঘাট, যান চলাচল, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী। স্থবির হয়ে গেছে অর্থনীতির চাকা। এদিকে খুলনায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ায় খুলনা জেলাকে লকডাউন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে আন্তঃজেলা যান-চলাচল বন্ধ রয়েছে, এমনকি জেলার অভ্যন্তরে স্বাভাবিক যান-চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি ও কৃষি-জাত পণ্যের সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক যান-চলাচলের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় এটিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রান্তিক কৃষকরা তাদের উত্পাদিত পণ্য বাজারে আনতে পারছেন না। অনেক পচনশীল কৃষিপণ্য বিক্রয় করতে না পারায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা না পারছেন লাভ করতে, না পারছেন উত্পাদনের খরচ তুলতে। এই অচল অবস্থা কৃষিপণ্য উত্পাদনে কৃষককে নিরুত্সাহিত করে তুলছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্ভূত করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকটের আভাস দিয়ে দেশবাসীকে সম্ভাব্য প্রতি ইঞ্চি জায়গাতে ফসল উত্পাদনের আহ্বান জানিয়েছেন। লকডাউনের অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে দেশবাসীকে শস্য, শাকসবজি ও তরিতরকারি উত্পাদনে শ্রম দিতে অনুরোধ করেছেন তিনি। কিন্তু লকডাউনের কারণে উত্পাদিত পণ্য বাজারজাত না হলে একই সঙ্গে শ্রম ও অর্থ বিনষ্ট হবে। তাই কৃষি উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরর দূরদর্শী ভাবনা থেকে উত্সাহিত হয়ে খুলনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন গ্রহণ করেছেন বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ, যা একই সঙ্গে স্থবির কৃষি অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছে এবং জাতীয় উন্নয়নে ইতিবাচক অবদান রাখছে।

                 খুলনা প্রশাসনের ভিশন হলো, উদ্ভূত করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে প্রান্তিক কৃষকদের কাছে সরাসরি কৃষিপণ্য ক্রয় এবং জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘বেসরকারি মানবিক সহায়তা সেল’ এর আওতায় নিম্নমধ্যবিত্তদের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণ এবং ডিজিটাল অ্যাপসভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থবির কৃষি অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা এবং জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখা।

মিশন :

ক) ঘরে আবদ্ধ সাহায্য প্রার্থীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ঘরে পৌঁছে দিয়ে লকডাউনের সফল বাস্তবায়ন করা। খ) লকডাউনের কারণে বাজারে আসতে না পারা প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকার সংস্থান করা। গ) ভোক্তা জনসমাগম এড়িয়ে, নির্বিঘ্নে বাসায় বসে মুদি পণ্য, গ্রোসারি আইটেম, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করতে পারবেন।  ঘ) কৃষিপণ্য উত্পাদনকারী তৃণমূল পর্যায়ের কৃষক সম্প্রদায় সহজেই অ্যাপসটি ব্যবহারের মাধ্যমে উত্পাদিত কৃষিজ পণ্য বিক্রয়ের একটি প্ল্যাটফরম পাবে।

ঙ)             দর-কষাকষির ঝামেলামুক্ত সুবিধাজনক, বিশ্বস্ত উপায়ে খাদ্যসামগ্রী কেনাকাটা করা। চ) ই-কমার্স পদ্ধতির মাধ্যমে ২৪/৭ কেনাকাটার সুবিধা।  ছ) বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতির ব্যবহার ক্রমশ বর্ধিত হবে। জ) দুধ, ডিম ও মাংস গ্রহণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ। ঝ) খামারিদের উত্পাদিত পণ্যের জোগান ব্যবস্থা সচল রাখা। ঞ) ঘরে বসে নিরাপদ পুষ্টি প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ। ট) মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাসকরণ।

জেলা প্রশাসন, খুলনার ‘বেসরকারি মানবিক সহায়তা সেল’-এর আওতায় মানবিক সহায়তা প্রদান ও কৃষি বিপণনের সমন্বয় সাধন : জেলা প্রশাসন, খুলনার উদ্যোগে করোনা সংকটকে মোকাবিলার জন্য গঠন করা হয়েছে ‘বেসরকারি মানবিক সহায়তা সেল’, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন। ‘বেসরকারি মানবিক সহায়তা সেল’-এ সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ীগণ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য অনুদান হিসেবে প্রদান করছেন। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন নিজস্ব অর্থায়নে কৃষিপণ্য ক্রয় করে বিতরণ করছে। এক্ষেত্রে খুচরা বাজার থেকে পণ্য ক্রয় করে খাদ্যসহায়তা প্রার্থীদের হাতে তুলে দিলে শুধু তারাই উপকৃত হতেন; কিন্তু সেই প্রান্তিক কৃষক থেকে যেতেন অবহেলিত, তার পণ্য থেকে যেত অবিক্রীত। জেলা প্রশাসক, খুলনা তার উদ্ভাবনী উদ্যোগ কাজে লাগিয়ে প্রান্তিক কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণ করেছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরাসরি অর্থ সহায়তা প্রদান না করে অনুদানের অর্থে তিনি প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে কৃষিপণ্য ক্রয় করেছেন। কৃষকরা তাদের উত্পাদিত শস্য, শাকসবজি, তরি-তরকারি, ফলমূল বিক্রি করছেন ‘বেসরকারি মানবিক সহায়তা সেল’-এর কাছে। এই কৃষিপণ্য তিনি বিতরণ করেছেন খাদ্যসহায়তা প্রার্থী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক কৃষকের চাহিদা ও সরবরাহকে সমন্বয় করে এই বাজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ‘বেসরকারি মানবিক সহায়তা সেল’-এর মাধ্যমে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে জেলা প্রশাসন, খুলনা। এতে উপকৃত হচ্ছে উভয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী; সচল রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনা; গতি সঞ্চার হয়েছে কৃষি অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি কৃষি-খাত। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি’র প্রায় ১৩ শতাংশ কৃষি-খাত থেকে এসেছে। বাংলাদেশের জিডিপি-তে সেবা ও শিল্প-খাতের ক্রমবর্ধমান অবদানের তুলনায় কৃষির অবদান নিছক কম নয়। কৃষি-খাতের সাথে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী। কৃষি পণ্য উত্পাদন, কৃষি পণ্য উত্পাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট কাঁচামাল উত্পাদন ও সরবরাহ এবং উত্পাদিত কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণের সাথে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকা। অনেক কৃষি শ্রমিক আছেন যাদের সংসারের প্রতিদিনের বাজার খরচ আসে প্রতিদিনের শ্রম-লব্ধ আয় থেকে। কৃষি পণ্য উত্পাদন, সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হলে সর্বাগ্রে ও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী এই কৃষি শ্রমিকেরা। করোনার এই সংকটকালীন মুহুর্তে কৃষকরা যেমন তাদের উত্পাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করতে পারছেন না, তেমনই বহু মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী খাদ্য সংকটে পড়েছে। অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ তাঁদের জীবিকা হারিয়েছেন। অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তপরিবার আছেন যারা প্রকাশ্যে সাহায্য চাইতে সংকোচবোধ করেন। এখানেই জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন তাঁর উদ্ভাবনী উদ্যোগকে কাজে লাগিয়েছেন; সমন্বয় করেছেন প্রান্তিক কৃষকের বিপণন ব্যবস্থা ও জীবিকা হারানো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদাকে।

পরিশেষে বলা যায়, করোনা দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি যত কঠিন ও প্রলম্বিত হোক না কেন, যথোপযুক্ত পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিকল্প কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখতে আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, খুলনার উদ্যোগে কৃষি অর্থনীতিকে সচল রাখার যে প্রয়াস তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ‘বেসরকারি মানবিক সহায়তা সেল’-এর মাধ্যমে একদিকে যেমন অসহায় কর্মহীন ও নিম্নমধ্যবিত্তদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে, একই সঙ্গে এসব খাদ্যসামগ্রীতে কৃষিপণ্য অন্তর্ভুক্ত করায় এবং কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি এসব পণ্য সংগ্রহ করায় করোনায় স্থবির কৃষি অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। পাশাপাশি ‘হাতের মুঠোয় কাঁচা বাজার’ ডিজিটাল অ্যাপসের মাধ্যমে ক্রেতাসাধারণের কাছে কৃষি ও পোলট্রি দ্রব্যাদি পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৃণমূলের উত্পাদনকারীদের কাছ থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করার মাধ্যমে কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাপক গতি সঞ্চার হচ্ছে। বিশেষভাবে ‘কৃষকের হাসি’ অ্যাপসের মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়ের উদ্যোগটি কৃষকদের সরাসরি উপকার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের পরিপ্রেক্ষিতে স্থবির কৃষি অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসন, খুলনার উপরোল্লিখিত উদ্ভাবনী উদ্যোগসমূহ সারাদেশে অনুসরণীয় হতে পারে।

লেখক : শিক্ষার্থী