করোনা ভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার রোধে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই জারি করেছিল লকডাউন। প্রায় দুই মাস সময় ধরে চলমান এই লকডাউনে ধুঁকছে বিশ্ব অর্থনীতি। তাই বাধ্য হয়েই দেশে দেশে অর্থনীতি সচল করতে তুলে নেওয়া হচ্ছে লকডাউন। অর্থনীতি যাতে আবার স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে, সেজন্যই লকডাউন ও বিধিনিষেধ শিথিল করছে দেশগুলো। কিন্তু কত দিনে অর্থনীতি স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ ধারণা করছে, এসব লকডাউনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এ বছর ৩ শতাংশ সংকুচিত হবে। কিন্তু এর আগে তারা ঠিক পুরো উলটো ধারণা করে বলেছিল যে এ বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে ৩ শতাংশ। ১৯৩০ সালের বিশ্ব মহামন্দা পরিস্থিতি (যা গ্রেট ডিপ্রেশন নামে পরিচিত) তৈরি হয়েছিল, তারপরই এই প্রথম করোনা ভাইরাসে বিশ্ব অর্থনীতিতে এ ধরনের ধস নেমেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি এই মন্দা পরিস্থিতি থেকে কীভাবে বের হয়ে আসবে?
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ বলছে, মন্দা হচ্ছে যখন সর্বক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায় এবং সেটা কয়েক মাসেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়। সাধারণত এটা প্রকৃত জিডিপি, প্রকৃত আয়, কর্মসংস্থান, শিল্প উত্পাদন এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রির মধ্যে প্রতিফলিত হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ বলছে, অর্থনীতিতে কোভিড-১৯-এর সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে ২০২০ সালের দ্বিতীয় কোয়ার্টারে—এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাসে।
তবে এটাও আশা করা হচ্ছে যে মে মাস নাগাদ বিশ্বের অনেক দেশের দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে খুলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হতে শুরু করবে। কিন্তু বছরের দ্বিতীয় ভাগের পর, অর্থাত্ জুন মাসের পরেও যদি লকডাউনের মতো বিধিনিষেধ বহাল থাকে, তাহলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে এবং তার ফলে বহু মানুষ চাকরি হারাবে। যদি এরকম কিছু হয়, তাহলে মন্দা আরো অনেক বেশি গভীর হবে এবং তা থেকে বেরিয়ে আসতেও অনেক সময় লাগবে।
ফলে আমরা চার ধরনের মন্দা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারি। এসব পরিস্থিতি চারটি ইংরেজি অক্ষর V, U, W অথবা L-এর মতো আকার নিতে পারে। অর্থনৈতিক মন্দা এবং তা থেকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদেরা এই চারটি অক্ষর ব্যবহার করে থাকেন। ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব চিলির একজন অর্থনীতিবিদ জোসে টেসাডা বিবিসিকে বলেছেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধির প্রাফের আকার তার মধ্যে এই অক্ষরগুলো প্রতিফলিত হয়।
আদর্শ যা হতে পারে :V
এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো বা আদর্শ যা হতে পারে তা হলো খুব দ্রুত অর্থনীতি পড়ে যাওয়ার পর সেটা আবার সঙ্গে সঙ্গেই খুব দ্রুত ওপরের দিকে উঠে যাওয়া। এটা দেখতে ইংরেজি V অক্ষরের মতো। এরকম পরিস্থিতিতে মন্দাভাব কম সময়ের জন্য স্থায়ী হয়।
নিউ ইয়র্ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল গ্রোনভাল্ড বিবিসিকে বলেছেন :সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার যেসব ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলো যদি দ্রুত তুলে নেওয়া হয় অথবা কোভিড-১৯ রোগের কোনো টিকা বা চিকিত্সা আবিষ্কৃত হয়, তাহলে আমরা খুব দ্রুত আগের জায়গায় ফিরতে পারব। দ্রুত আমাদের আগের পথে ফিরে যেতে পারব। এসঅ্যান্ডপির আশঙ্কা, ২০২০ সালের এপ্রিল, মে ও জুন—এই তিন মাসে অর্থনীতি ৯ শতাংশ সংকুচিত হবে। তাই তিনি খুব একটা আশাবাদী নন যে খুব দ্রুতই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।
সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা :U
এসঅ্যান্ডপির ধারণা, ২০২০ সালে অর্থনীতি ২ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পাবে, কিন্তু পরের বছর, অর্থাত্ ২০২১ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। মি. গ্রোনভাল্ড বলেন, এখন আমরা যে অবস্থা দেখতে পাচ্ছি, তাতে মনে হচ্ছে এই পুনরুদ্ধারের বিষয়টি U অক্ষরের মতো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এর অর্থ হলো বেশির ভাগ ক্ষতিই আমরা কাটিয়ে উঠব, তবে তার গতি হবে ধীর, ফলে একটু সময় লাগবে। মুডির সর্বশেষ অর্থনৈতিক পূর্বাভাস হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের ক্ষত ২০২১ সালের অর্থনীতি জুড়ে রয়ে যাবে। তিনি বলেন, আমরা দেখছি যে চীনে লকডাউন তুলে নেওয়া হচ্ছে, কলকারখানা আবার খুলে দেওয়া হচ্ছে। একেক শিল্পে দেখা গেছে যে কোথাও ৪৫ শতাংশ আবার কোথাও ৭০ শতাংশ পুনরুদ্ধার হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
পুনরুদ্ধারের কঠিন পথ :W
কোভিড-নাইনটিন প্রতিরোধে এখনো কোনো টিকা বা এর কোনো চিকিত্সা আবিষ্কৃত হয়নি, যার ফলে আমাদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে জানালেন মি. গ্রোনভাল্ড। সরকারগুলো এখন বিধিনিষেধ শিথিল করতে পারে, যার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবার শুরু হবে। তবে যদি দ্বিতীয় দফায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে শুরু করে, তখন পুনরায় লকডাউন কঠোর হতে পারে, যার ধাক্কা আবার গিয়ে লাগতে পারে অর্থনীতিতে। এক্ষেত্রে অর্থনীতিতে দুবার পতন ঘটতে পারে বা মন্দা দেখা দিতে পারে, যা দেখতে ইংরেজি W অক্ষরের মতো, বলেন প্রফেসর টেসাডা। একবার ছেদ ঘটার পর চূড়ান্তভাবে পুনরুদ্ধারের ঘটনা ঘটবে। প্রথম দফায় অর্থনীতি মন্দা পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসবে ঠিকই, কিন্তু স্থায়ী হবে না। এরপর আবারও পতন ঘটবে। আমরা যদি আবারও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থায় ফিরে যাই, তাহলে অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
এক ‘নতুন স্বাভাবিক’ অবস্থা :L
অনেকেই বলছেন, করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন স্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হতে পারে কি না। এই পরিস্থিতি ইংরেজি অক্ষর L আকৃতির। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে দ্রুত ও বড়ো ধরনের পতনের পর পুনরুদ্ধার ঘটে, কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে যায় কম মাত্রায়। এটা মন্দার চাইতেও বেশি, এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির মাত্রায় স্থায়ীভাবে পরিবর্তন ঘটবে। এসঅ্যান্ডপি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, করোনা ভাইরাসের টিকা কিংবা চিকিত্সা বের না হলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে।—বিবিসি