বিপুলা পৃথিবী হইতে চিরবিদায় হে মহত্প্রাণ!

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমাদের মধ্যে আর নাই—এই সংবাদটির মধ্যে ভারত ভাগ, বাংলাদেশের জন্ম এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসের এক আশ্চর্য সাক্ষীর উপস্থিতি রহিয়াছে। বলা হইয়া থাকে, লিখিত ইতিহাসের দুই লাইনের মধ্যে যেই অনুল্লেখ্য সাদা অংশ রহিয়াছে, তাহাতেই সুপ্ত থাকে সত্যের চিহ্ন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন উহার অপূর্ব এক সত্যান্বেষী। একটি দেশ ও সমাজের বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রের সংকটকালে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে জাতি গঠনে যেই ভূমিকা পালন করেন, তাহার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এইখানে গলদ থাকিলে ভবিষ্যতে তাহার চরম মূল্য দিতে হয় দেশ ও জাতিকে। ইহা উল্লেখ করা অতিরঞ্জিত হইবে না যে, আনিসুজ্জামান স্যার ছিলেন আমাদের বৌদ্ধিক জগতের বাতিঘর। সেই বাতিঘর গতকাল বিকালে চিরতরে নিভিয়া গেলেন! প্রকৃত অর্থে একজন আনিসুজ্জামানকে পাইতে আমাদের অনেক বত্সর অপেক্ষা করিতে হয়।

বিভিন্ন দেশে ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানী, কবি-সাহিত্যিক ও দার্শনিকদের জীবনী ও কর্মকাণ্ড দেখিলে আমরা বুঝিতে পারি—সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট বিষয়ে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা কতখানি তাত্পর্যপূর্ণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা হইতে মানবজাতিকে রক্ষা করিতে ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল, মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাংক বিশেষ ভূমিকা রাখিয়াছিলেন পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী মেনিফেস্টো প্রকাশের ক্ষেত্রে। নাজিম হিকমতের মতো কবিরা বিবিধ আগ্রাসন ও জাতি-জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন-নিপীড়নের বিরোধিতা করিতে গিয়া কারাগারে দিনাতিপাত করিতেও কুণ্ঠিত হন নাই। দেশে দেশে এমন শত শত উদাহরণ দেওয়া যাইবে। আমাদের বৌদ্ধিক বাতিঘর অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও ছিলেন একটি মানবিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম বলিষ্ঠ সৈনিক। তার জন্ম হইয়াছিল ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাটে। তিনি চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষক। ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ছিলেন তিনি। পুরো বাংলাদেশের স্পিরিট, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংবিধানে ব্যবহূত বিভিন্ন শব্দের তাত্পর্য, উত্পত্তি বুঝার মতো যেই ক্ষমতা থাকা দরকার আমরা তাহার অভাব মিটাইতে পারিয়াছিলাম, কারণ আমাদের একজন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন। তাহার অসংখ্য পদক, সম্মান এবং উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের সম্ভার তাহাকে পুরোপুরি অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট নহে। দেশের সকল প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রবর্তী মানুষ ছিলেন তিনি। বৌদ্ধিক বাতিঘর হিসাবে তিনি দৃপ্তপদে আলো হাতে চলিয়াছেন আঁধারের যাত্রী হইয়া। মানবিকতা ও প্রগতিশীলতার আলো ছড়াইয়া দিয়াছেন রাষ্ট্রের কোণে কোণে। তাহার রচিত আত্মজীবনী ‘বিপুলা পৃথিবী’তে আমরা দেখিয়াছি ব্যক্তিগত আখ্যান কীভাবে মিলিয়া মিশিয়া গিয়াছে দেশের স্বাধীন সত্তা তৈরির ক্রমবিকাশমান ইতিহাসের সহিত!

আমাদের বৌদ্ধিক জগত্ অনেক আগেই হইতেই বহুধা বিভক্ত। বিভিন্ন ধারা-উপধারায়, দল-উপদলে বিভক্ত আজকের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতো বাতিঘর আমাদের সংস্কৃতির লালন ও চর্চা, ঐক্য নির্মাণে যেই ভূমিকা রাখিয়াছেন তাহা এই দেশ যুগ যুগ ধরিয়া মনে রাখিবে। জাতির অন্যতম পথপ্রদর্শক অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের এই চিরবিদায় আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটি অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা তাহার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করিতেছি।