নাজমুল হুদা
করোনার কারণে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস এবং বাংলা নববর্ষ—এই দুটি উত্সবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের যে সঞ্চালন হয় তা স্বভাবতই স্থবির। শুধু বাংলাদেশ নয় ধারণা করা হচ্ছে, পৃথিবীজুড়ে কোভিড-১৯ অনেকগুলো ছোটো ব্যবসাকে লাইফ সাপোর্টে নিয়ে যাবে! এই সংকট থেকে আমাদের সম্ভাবনাময় ও ক্রমবিকাশমান এসএমই খাতকে কিভাবে রক্ষা করা হয় সেটিই এখন চিন্তার বিষয়। Fintech, Small Business & American Dream বইয়ের লেখক ও ২০০৭-২০০৮-এর বৈশ্বিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনরুদ্ধার কাজে ওবামা প্রশাসনের একজন সক্রিয় কর্মী ক্যারেন জি মিলস মনে করেন, ‘এই বিশেষ সংকট চলাকালীন আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে রাখতে এক নম্বর কাজ হবে ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা করা, পাশাপাশি তাদের কর্মচারী এবং তাদের পরিবারকে সহায়তা করা।’
এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কতটুকু প্রস্তত? ২০১৯ সালের শিল্প খাতের জরিপ অনুযায়ী দেশের ৪৬২৯১ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ৯৩ ভাগই অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি। অণু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা এমএসএমই-র অবদান জিডিপির ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এ খাতের উদ্যোক্তাদের আয় ও সঞ্চয় সীমিত। ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও কম। ফলে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় এনে এই খাতকে টিকিয়ে রাখার বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে। করোনাকালের এই সংকট কাটিয়ে পুনরায় ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে চাঙ্গা করতে বেশ কিছু পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা উঠে এসেছে ক্যারেন জি মিলসের আলোচনায়, যা বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হতে পারে—
প্রথমত, ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থ প্রবাহ বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করা। বাংলাদেশে ৭৮ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি উত্পাদন ও রপ্তানিতে কাজ করছে। এমএসএমই তাদের পণ্য নিকট ভবিষ্যতে কতটা বিক্রি করতে পারবে, তা নিয়ে শঙ্কা আছে। এমএসএমই-র পণ্য উত্পাদন নির্ভর করবে বাজারের সার্বিক চাহিদার ওপর। পণ্যের চাহিদা না থাকলে, পণ্য বিক্রি না হলে যাতে কর্মী ছাঁটাই না হয় সেজন্য সরকারি নির্দেশনা প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নমনীয় হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট ‘ঋণ প্যাকেজ’ থাকতে পারে। যেখান থেকে নির্ধারিত একটি অংশ স্বল্প সুদে উদ্যাক্তারা ধার নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে এমএসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়টিও ভাবা যেতে পারে। গার্মেন্টসশিল্পের সহায়তার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি অথবা বিকল্প হিসেবে একটি তহবিল গড়ে তোলা, যেখান থেকে অতি অল্প সুদে এমএসএমইদের ঝুঁকি মোকাবিলা ঋণ প্রদান করা হবে।
তৃতীয়ত, বিপণনব্যবস্থায় সহায়তার জন্য অনলাইনে কেনাকাটার মালামাল পৌঁছানো যেন সহজ ও নিরাপদ হয়, সে জন্য মালামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্ক হয়ে পণ্য পৌঁছাতে হবে। পাশাপাশি মোবাইলভিত্তিক আর্থিক লেনদেন নগদ বিকাশ করেই এরা অনলাইন কেনাকাটায় বিশেষ সুবিধা দিতে পারে। তাছাড়া, সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা তাঁদের স্থানীয় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে উপহার কার্ড কিনে সহায়তা করতে পারেন, যা ছোটো ছোটো দোকানগুলিকে চালিত রাখতে সহায়তা করবে।
একইসঙ্গে বকেয়া বা ঋণের বিষয়গুলো পুনঃবিন্যাসের মাধ্যমে আরো সহনীয় ও সহজ করা। এই কঠিন সময়ে চলমান সংকটে সম্মিলিত উদ্যোগ, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও সকলের সহযোগিতায় আমরা কিছুটা হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ক্ষতি প্রশমন করতে পারব, টিকিয়ে রাখতে পারব এসএমই খাতকে।
ঢাকা