লকডাউনে অপ্রয়োজনীয় সিজার কমলেও প্রসূতির ঝুঁকি বেড়েছে

দেশে লকডাউন পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনীয় সিজার কমেছে। পাশাপাশি যেসব মায়ের জন্য সিজার প্রয়োজন ছিল, তারাও সিজারের সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, আগে যেমন বাড়িতে বেশি প্রসব হওয়ার কারণে বেশি মায়ের মৃত্যু হচ্ছিল, আমরা চেষ্টা করছিলাম হাসপাতালে যেন প্রসব করানো হয়। এই লকডাউন পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ মা হাসপাতাল বাদ দিয়ে বাড়িতে ডেলিভারি করাচ্ছেন। ফলে মায়ের জীবনের ঝুঁকি আরো বেড়েছে এবং মাতৃমৃত্যু ও প্রসব-পরবর্তী জটিলতা বেড়েছে এই পরিস্থিতিতে। তবে শহরে যে মায়েরা থাকেন, হাসপাতালের সুবিধা কাছাকাছি থাকায় সেই মায়েরা প্রয়োজন পড়লে হাসপাতালে সিজার ঠিক করাতে পারছেন। কিন্তু আমাদের ৮০ শতাংশ মা-ই থাকেন শহরের বাইরে।  বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫ হাজার ৪৭৫ জন মা মৃত্যুবরণ করেন। আর প্রতিদিন মারা যান ১৫ জন মা। আর মোট মাতৃমৃত্যুর ৫৪ শতাংশ ঘটে বাড়িতে প্রসবের কারণে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে একটা বিশাল পরিমাণ সিজার করা হয় অযথা এবং সেটা বেশি হয় গ্রাম-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন ক্লিনিকে। কিন্তু এখন যেহেতু ক্লিনিকগুলো বন্ধ রয়েছে, ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না, সে কারণে অপ্রয়োজনীয় সিজার কমে গেছে। এতে আমরা খুশি। আর সরকারি মেডিক্যাল কলেজে যেসব সিজার হয়ে থাকে, সেগুলো সবই রেফার্ড রোগী। উলটো দিকে আবার লক্ষ করা যাচ্ছে, যেসব মায়ের বাচ্চা ও মাকে বাঁচাতে সিজারের প্রয়োজন ছিল, সেই মায়েরা সিজারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যেমন বিলম্বিত প্রসব, রক্তক্ষরণ বা একলাম্পশিয়া হয়ে গেছে, তারা যখন হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার পাচ্ছেন না। সিজার করলে হয়তো মা-বাচ্চা বেচে যেত, তিনিও কিন্তু বঞ্চিত হলেন এই লকডাউন পরিস্থিতিতে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল ইত্তেফাককে বলেন, লকডাউনে প্রসবের সারা দেশের চিত্র এক রকম; শহরের চিত্র আরেক রকম। শহরে মেডিক্যাল কলেজে যেসব সিজার হয়, সেসব রেফার্ড রোগী। তাদেরই মূলত সিজার হওয়ার কথা। তারা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগী। সেই সব জায়গায় সিজার একই রকমের আছে।

দেশের মায়েরা যে কত অবহেলিত, সে প্রসঙ্গে ডা. কাজল বলেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন ১৫ জন গর্ভবতী মা মারা যান। এই ১৫ জনের মধ্যে ৯ জন মা-ই মারা যান বাড়িতে প্রসব করানোর করণে। ঐ সব মা যদি হাসপাতালে মারা যেতেন, তাহলে হাসপাতালের ত্রুটি বলা যেত। একটা মা মারা যাওয়ার আগে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় পান। অথচ ঐ সময়ের মধ্যে গর্ভবতী মাকে কমিউনিটি ক্লিনিক, থানা হাসাপাতাল বা উপজেলা হাসপাতাল—কোথাও নেওয়া হয় না। এতে মায়ের মৃত্যু হয়। যে কারণে আজও আমাদের দেশে ৫৪ শতাংশ মা বাড়িতে মারা যাচ্ছেন। অথচ এসব মাকে থানা, কমিউনিটি যে কোনো প্রতিষ্ঠানে নিলে এই মৃত্যু কমিয়ে আনা যেত। ডা. কাজল বলেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতিটাই এমন যে, এমনিতেই মায়েদের প্রসবের সময় হাসপাতালে নেওয়া হয় না, সেখানে লকডাউনের এই পরিস্থিতিতে আমরা কি মনে করতে পারি না যে আরো বেশি মা মারা যাচ্ছেন? লকডাউনে মায়েদের হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে না। ফলে তাদের জীবন কিন্তু আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রওশন আরা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা এই কোভিড-১৯-এর সময়ও প্রতিটি জেলায় মনিটর করছি। আমরা চেষ্টা করছি হোম ডেলিভারি যেন না বাড়ে। কারণ এতে মাতৃমৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। সেখানে প্রচুর পরিমাণে হোম ডেলিভারি হচ্ছে। আর এ কারণে প্রচুর রোগী আসছে জরায়ুর বিভিন্ন সমস্যা, একলাম্পসিয়া, ফিস্টুলাসহ নানা সমস্যা নিয়ে।’ স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ও (স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন) ‘ওজিএসবি’ সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, হোম ডেলিভারি বেড়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর বাড়িতে ডেলিভারি হলে সেটা নরমালই হয়, জটিলতাও সেখানেই হয়, মৃত্যুও সেখানে হয়। হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি হচ্ছে না তা নয়। যে ডেলিভারিটা নরমাল হতো সেটা পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে বাসায় করছে।