করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহে বিপত্তি

দেশে করোনা রোগী শনাক্তে নমুনা সংগ্রহে বিপত্তির ঘটনা ঘটছে। নমুনা সংগ্রহের মূল দায়িত্ব পালন করে থাকেন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টরা। কিন্তু দেশে দক্ষ টেকনোলজিস্টের চরম সংকট। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে অনেককে নমুনা সংগ্রহ করতে পাঠানো হচ্ছে। এ কারণে প্রতিদিন সংগ্রহ করা অনেক নমুনা নষ্ট হচ্ছে। মাঠ থেকেই আসছে ত্রুটিপূর্ণ নমুনা। মাঠপর্যায়ে যারা নমুনা সংগ্রহ করছেন, তারা সঠিকভাবে নমুনা সংগ্রহ না করতে পারায় এ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। করোনা পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত ল্যাব সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা উপসর্গ থাকা ব্যক্তির যে ধরনের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানোর কথা, তা পাচ্ছেন না। ফলে প্রতিদিনই নমুনার একটি বড়ো অংশ মেশিন শনাক্ত করতে পারছে না। এ কারণে ফলস রিপোর্টও আসছে অহরহ। কারো কারো                প্রথমে ফল নেগেটিভ আসছে। পুনঃপরীক্ষায় সেই রিপোর্টই আবার পজিটিভ হচ্ছে। অর্থাত্ পরীক্ষাগার থেকে সকালে যদি নেগেটিভ বলা হয়, তা সন্ধ্যায় পজিটিভ বলা হচ্ছে। একজন ডাক্তারসহ পেশাজীবীর ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটেছে। অদক্ষ জনবলের কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল জানান। তিনি বলেন, অদক্ষ লোকদের দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হলেই সকালে পজিটিভ ও বিকালে নেগেটিভ ফল আসবে। এটাই স্বাভাবিক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, নমুনা সংগ্রহ আনাড়ি লোক দিয়ে করলে এমনই হবে। শিক্ষিত লোক বেকার, আর অশিক্ষিত লোক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-ভিসি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন বলেন, পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ওপরই নির্ভর করে সঠিক ফল। এজন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। অদক্ষদের দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হলে ভুল হবেই। তিনি বলেন, করোনা মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতি নিতে সরকার সাড়ে তিন মাস সময় পেয়েছে। এখন কেন ভিডিও কনফারেন্সে প্রশিক্ষণ দিতে হবে? এক্ষেত্রে তিনি ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার উদাহরণ তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অনেক ওপরে। কিন্তু তারা সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়ায় করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সফল হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, শূন্য পদে নিয়োগ দিতে বহুবার মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে আবেদন করেছি। কিন্তু বছরের পর বছর সেই আবেদনে কেউ সাড়া দেয়নি। পদ থাকতে আমরা বেকার। অথচ আমরা তিন বছরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ। আর অদক্ষদের দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। তারা স্বাস্থ্য খাতকে জিম্মি করে রেখেছেন। তারা শুধু কেনাকাটায় ব্যস্ত। তারা যদি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে করোনা পরিস্থিতি আরো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।

এদিকে করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করার জন্য চিকিত্সক ও নার্সদের মতো ২ হাজার মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার তিনি এই নির্দেশ দেন। এজন্য বাংলাদেশ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. সেলিম মোল্লা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

বর্তমানে যে পদ্ধতি (আরটিপিসিআর) ব্যবহার করে শনাক্তকরণের পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেটি বেশ জটিল। অধিকাংশ কেন্দ্রে এই পরীক্ষা করার মতো দক্ষ টেকনোলজিস্টের সংকট রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠন অভিযোগ করেছে, সাত বছর ধরে এসব পদে নিয়োগ বন্ধ রেখেছে সরকার। সারাদেশে সরকারি মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের পদ রয়েছে ৭ হাজার ৯২০টি। কর্মরত আছেন আছেন ৫ হাজার ১৬৫ জন। শূন্য পদ আছে ২ হাজার ৭৫৫টি। এদিকে সারাদেশে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) পদ রয়েছে ২ হাজার ১৮২টি। কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৪১৭ জন। শূন্য পদ আছে ৭৬৫। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) এরাই মূলত নমুন সংগ্রহ ও পরীক্ষা করে থাকেন। রাজধানীসহ সারাদেশে করোনা রোগী শনাক্তে নমুনা সংগ্রহে কাজ করছেন ৫০০ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব)। এর মধ্যে ১৩৫ জন করোনায় আক্রান্ত। অথচ শুধু ঢাকা শহরেই প্রয়োজন ৫০০ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব)। কোনো কোনো জেলায় একজন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) নমুনা সংগ্রহ করছেন। আবার অনেকের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একদিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতে মাঠে পাঠানো হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রীয় চিকিত্সা অনুষদের অধীনে তিন বছরের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট হতে হয়। এমন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত  ৩০ হাজার মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট বেকার রয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ হাজার আছেন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব)। অথচ এদের না নিয়ে নন- মেডিক্যাল পার্সনদের একদিনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করানোর কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, বাচ্চার জন্ম দেওয়ার পরই তাকে বাবা বলতে বলা হচ্ছে। অথচ তিন মাসের আগে শিশুরা তো বাবা ডাকতে পারে না। নন-মেডিক্যাল পার্সনদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করানো তেমনই অবস্থা। এতে ভালো ফলাফল আশা করা যায় না। সম্প্রতি একজন ডাক্তারের করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষায় পজিটিভ আছে। পরদিন আবার পরীক্ষায় নেগেটিভ আসে। একজন সাংবাদিকের সকালে পরীক্ষায় নেগেটিভ আসলেও বিকালে আসে পজিটিভ ফল।