করোনাকালের শিক্ষা যেন ভুলিয়া না যাই

করোনায় কত কী ক্ষতি হইল! তবে অন্তত একটি ভালো দিক সমগ্র বিশ্বে প্রতিভাত হইয়াছে। তাহা হইল, বায়ুদূষণের নিম্ন হার। প্রতি বত্সর বায়ুদূষণের জন্য বিশ্বে ৯০ লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৃত্যুবরণ করে। সুতরাং বায়ুদূষণের হার হ্রাস পাওয়াটা অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের হিসাবে ঢাকার বায়ুর মান গত মাসে আগের বত্সরের তুলনায় ৩০ শতাংশ ভালো। অন্যদিকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের হিসাবে গত ৪৬ দিনে ঢাকার বায়ু আগের বত্সরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ ভালো। মূলত করোনা পরিস্থিতিতে যানবাহন ও নির্মাণকাজ বন্ধ থাকিবার কারণে বায়ুর মানের এই উন্নতি ঘটিয়াছে। কেবল বায়ুদূষণ নহে, করোনার এই কালবেলায় বায়ুদূষণ হ্রাসের কারণে প্রকৃতি যত সবুজ হইয়াছে, ততই বেশি সংখ্যায় দেখা যাইতেছে দীর্ঘদিন অন্তরালে থাকা পশু, পাখি, পতঙ্গদের। প্রজাপতি, মৌমাছিসহ বিভিন্ন পতঙ্গ বৃক্ষের পরাগমিলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়া থাকে। সুতরাং ইহাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাইলে তাহা ফসল ও গাছপালা বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক। শুধু ঢাকা নহে, সারা দেশেই কার্বন নির্গমন আশ্চর্য রকম হ্রাস পাইয়াছে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, আকাশ শুধু পরিষ্কার নহে, বাতাসে নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং পিএম২৫-এর পরিমাণও ব্যাপক কমিয়া গিয়াছে। এই ‘পিএম২৫’ এক অতি ক্ষুদ্র কণা, যাহা নিশ্বাসের সহিত শরীরে প্রবেশ করিয়া সোজা রক্তে মিশিয়া যায়। তবে একা নহে, ইহা এমন অনেক বিষ বহিয়া লইয়া রক্তে মিশায়, যেইগুলি ফুসফুস ও হূদ্যন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি করিয়া দেয়।

এখন পরিষ্কার হাওয়া শরীরে অন্য এক স্বস্তির বার্তা পৌঁছাইয়া দিতেছে বটে। আমরা কি আমাদের ভবিষ্যতের আরাম-আয়েশের মান এবং প্রকৃতি এই পরিবর্তনগুলির ওপর ভিত্তি করিয়া তৈরি করিতে পারি না? নীল আকাশ আর পরিষ্কার বাতাস কি আধুনিক মানবসভ্যতার আবশ্যিক শর্ত হইতে পারে না? এই জন্য এই সময়টিকে আরো গভীরভাবে মূল্যায়ন করিতে হইবে। ঢাকার বায়ুদূষণের কোন উত্সগুলি কীভাবে হ্রাস করা যাইতে পারে, তাহা ইহার মধ্য দিয়া চিহ্নিত করা যাইতে পারে, যাহাতে ভবিষ্যতে ঢাকার বায়ুর মান ভালো করিবার পরিকল্পনা করা যায়।

একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখিতে হইবে, এই বিশ্বের কথিত ‘সভ্য’, আত্মমোহে মুগ্ধ জীবনশৈলী যতকাল থাকিবে ততকাল মহামারি বারবার আসিবে, আমাদের সঙ্গ ছাড়িবে না। বিবর্তনের নিয়মেই সেই সকল ভয়ংকর জীবাণু চরিত্র পালটাইবে, হীনবলও হইবে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা যেন আমরা সহজেই ভুলিয়া না যাই। নইলে ভবিষ্যতে আমাদের আরো বড়ো ক্ষতির আশঙ্কা থাকিবে। এই মুহূর্তে গৃহবন্দি থাকিয়া প্রকৃতিকে সজীব হইবার সুযোগ দিয়া সাময়িকভাবে এই সমস্যা সামাল দেওয়া সম্ভব হইলেও ভাইরাসের সহিত কীভাবে বসবাস করিতে হইবে এবং প্রকৃতিকে কীভাবে রক্ষা করিতে হইবে, সেই উপায় আমাদেরই খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে।